ডায়েরির শেষ পাতা | Diaryir Sesh Pata
Diaryir Sesh Pata written by Olivia Das
ধুর ..আর ভালো লাগে না …আজ হলো সেই অসহ্যকর রাত্রি।
কাল আমার অঙ্ক পরীক্ষা। পরীক্ষার আগের রাতে কি আর পুরো বই এর অঙ্ক রিভাইস দেওয়া যায়!! এদিকে আবার হঠাৎ ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়েছে, কারেন্ট ও চলে গেছে বোধহয়। বোধহয় ঝড় বৃষ্টির জন্যই বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়েছে কোথাও!! মোমবাতির আলোতে আমার অঙ্ক করতে একদমই ভালো লাগে না, আর আজকে তো আরোই ভালো লাগছেনা। তাই কি আর করি ডায়েরি লিখতে বসেছি।
এই ডায়েরিটার আর কয়েকটা মাত্র পাতা বাকি আছে…. মা বলেছে নতুন একটা ডায়েরি কিনে দেবে খুব তাড়াতাড়ি। মা এখন খালি কাঁদে..থেকে থেকেই দেখি চোখ দিয়ে জল গড়ায়.. কেন যে এতো কাঁদে কে জানে??
কতবার মা কে জিজ্ঞাসা করেছি যে, “মা তুমি কাঁদছো কেন ??” মা কিছুই উত্তর দেয় না, শুধু কাঁদে। আমার খুব কষ্ট হয় মায়ের জন্য।
কখন থেকে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হচ্ছে, কেউ দরজা খুলছে না। বৃষ্টির শব্দতে মনে হয় কেউ শুনতে পাচ্ছে না। ওইতো পিসিমনি দরজা খুলে দিয়েছে।
মা আর বাবা এসেছে, মায়ের হাতে কতগুলো রজনীগন্ধার স্টিক। আমার খুব ভালো লাগে রজনীগন্ধার স্টিক।
বাবা মা পিসিমনি সবাই ভিতরের ঘরে গিয়ে বসলো। আমার অঙ্ক পরীক্ষা বলে কেউ আমাকে ডিসটার্ব করছে না,নইলে আমিও যেতাম ওই ঘরে। কিন্তু মা এসেছে তাই মা এর কাছে যাবো আর ওই ঘর এ বসেই ডায়েরি লিখবো। অন্ধকারে একা একা বসে থাকতে ভয় করে আমার।
মা সোফায় আছে..আমি মায়ের পাশে সোফায় এসে বসলাম …এখানে বসেই এখন ডায়েরি লিখছি। মা আমার সাথে কথা বলছেনা কেন কে জানে? খালি চুপ করে বসে আছে। বাবা আর পিসিমনিও চুপ করে বসে আছে। মা আমার সাথে কথা না বললে আমার মোটেও ভালো লাগে না। মা মনে হয় আমার পরীক্ষার জন্য চিন্তা করছে? মা কে যে চিন্তা করতে বারণ করবো, সেটাও বলা যাবে না। কারণ মা যখন চুপ করে বসে থাকে তখন মা কে ডাকলে মা রেগে যায়, মা তো লেখে, লেখার সময় অনেক ভাবতে হয়। তাই এখন মা কে ডাকবো না। আমারও লিখতে খুব ভালো লাগে, তাই জন্যই তো মা আমাকে এই ডায়েরিটা কিনে দিয়েছে। রজনীগন্ধার স্টিকটাও মা ফুলদানিতে রাখেনি। কারেন্ট এলে রাখবে হয়তো?? তারপর আমিও আমার পড়ার ঘরে গিয়ে দুটো ফুলের স্টিক রেখে আসব।
এই তো, কারেন্ট এসে গেছে। মা উঠে পড়েছে, আমিও এবার যাই, একটু অঙ্ক প্র্যাক্টিস করে নিই।
পরের দিন সকালে স্নিগ্ধার হটাৎ-ই চোখ পরে মিমির ডায়েরিটার ওপর। স্নিগ্ধা হলো মিমির মা। ডায়েরিটা তো এখানে থাকার কথা নয় ….এখানে তো থাকার কথা নয়?? স্নিগ্ধা তো ডায়েরিটা গুছিয়ে রেখে এসেছিল মিমির ঘরে। আনমনা হয়ে ভাবতে ভাবতে ডায়রির পাতা উল্টে পাল্টে দেখতে গিয়ে শেষ কয়েকটা পাতায় চোখ পরে স্নিগ্ধার…কিছুটা পড়েই অবাক হয়ে যায়। স্নিগ্ধা আর ভাবতে পারছে না। হটাৎ করে স্নিগ্ধার মনে পরে যে মিমির স্কুলের ফোন নাম্বার তার মোবাইল এ সেভ করা আছে। সঙ্গে সঙ্গে স্নিগ্ধা মোবাইলে নম্বর টা ডায়াল করে। কিছুক্ষন ফোনটা বেজে যাওয়ার পর ফোনের ওপার থেকে উত্তর আসে,
-“হ্যালো? কে বলছেন?”
-“আমি স্নিগ্ধা চ্যাটার্জী কথা বলছিলাম,আমার মেয়ে আপনার স্কুলের ক্লাস 4 এর স্টুডেন্ট
“হ্যাঁ বলুন কিভাবে সাহায্য করতে পারি আপনাকে”
আমার একটা কথা জিজ্ঞাসা করার ছিল?”
-“আজ কি ক্লাস ফোর এর অঙ্ক পরীক্ষা ছিল?”
–
“হ্যাঁ ম্যাম।”
স্নিগ্ধা আর কিছু উত্তর দিতে পারলো না, ফোন টা রেখে দিলো। আজ এক সপ্তাহ হলো মিমি সবাইকে ছেড়ে অনেক দূরে এ চলে গেছে,মিমিকে স্নিগ্ধা বাঁচাতে পারেনি কিন্তু মিমির ডায়েরিতে লেখা কথাগুলো পরে তো স্নিগ্ধা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সত্যিই কি মিমি এসেছিলো?
মিমির ডায়েরি টা স্নিগ্ধার কোলের ওপর খুলে রাখা, ডায়েরির শেষ পাতাগুলো পাখার হাওয়ায় উড়ছে। আজ আর অত জোরে বৃষ্টি পড়ছে না। স্নিগ্ধা মিমির ডায়েরি টা বন্ধ করে মিমির ছবির পাশে রেখে দেয় আর ছবির সামনে আরো কয়েকটা রজনীগন্ধার স্টিক ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখে। মিমির ছবির দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধা অচিরেই একটু হাসে।
মিমি চলে যাওয়ার পর, বেশ কিছুদিন কেটে গেছে,সুরজিৎ অর্থাৎ স্নিগ্ধার স্বামী স্নিগ্ধাকে আবার নতুন করে লিখতে শুরু করতে বলেছে। সুরজিৎ জানে স্নিগ্ধা ওর কাজটাকে কতটা ভালোবেসে করে, তাই সুরজিৎ চাইছে যে স্নিগ্ধা আবার স্বাভাবিক জীবনে খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসুক কিন্তু স্নিগ্ধা মিমির এভাবে চলে যাওয়াটা ঠিক মেনে নিতে পারছে না। এইতো মেয়েটা কত excited ছিল যে স্কুল এর final exam হয়ে গেলে বাড়ির সবার সাথে শান্তিনিকেতন যাবে কিন্তু সে তো আর….!! থাক সেসব কথা স্নিগ্ধা আর মনে করতে চায় না। অনেক চেষ্টা করেছে আবার লিখতে শুরু করার কিন্তুএখন আর লিখতে যেন ভালো লাগে না স্নিগ্ধার।
বেশ কয়েকদিন থেকেই সুরজিৎ এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করছে,
কিরে …পড়তে বসার সময় কখন হবে
তাই বুঝি ..শুধু ডায়েরি লেখা..যা পড়তে বোস
আরে বাবা দেবো নতুন ডায়েরি এনে …আগে স্কুল এর homework টা তো করে নে
স্নিগ্ধা যেন কার সাথে কথা বলে একা একা!! প্রথম প্রথম সুরজিৎ ভাবতো যে হয়তো স্নিগ্ধা আবার লেখা শুরু করেছে,তাই সেই গল্পের চরিত্রগুলোর সংলাপ হয়তো নিজেই পড়ে পড়ে দেখছে, এরকম স্নিগ্ধা আগেও অনেকবার করেছে। স্নিগ্ধা সুরজিৎকে বলেছে কতবার., “আমার যদি নিজের লেখা পছন্দ না হয় তাহলে আমার পাঠকদের কিভাবে পছন্দ হবে আমার গল্প??”
তাই প্রথম দিকটা সুরজিৎ এই ব্যাপারটাতে অতটা আমল দেয়নি। সুরজিৎ খুব খুশি হয়েছিল এই ভেবে যে স্নিগ্ধা আবারো স্বাভাবিক জীবন এ ফিরে আসছে। কিন্তু গত দুইদিনের অভিজ্ঞতা থেকে সুরজিৎ এর এই ধারণা ভেঙে গেছে।
পরশুরাতের ঘটনা…. সুরজিৎ আর স্নিগ্ধা রাতেr খাওয়া দাওয়া সেরে শুয়ে পড়েছে বেশ খানিকক্ষণ, হঠাৎই স্নিগ্ধার গলা শুনতে পেলো সুরজিৎ,স্নিগ্ধা কারোর সাথে ফিশফিশ করে কথা বলছে।
মোবাইলে সময়টা দেখলো, ২টো বেজে ৪৫ মিনিট ।
“এতো রাতে স্নিগ্ধা কার সাথে কথা বলেছে??”
আর কিছু না ভেবে সুরজিৎ স্নিগ্ধার গলা শুনে এগিয়ে গেলো । স্নিগ্ধা মিমির ঘরে বসে কারোর সাথে কথা বলছে , সুরজিৎ মিমির ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো…. কিন্তু কোথায়? ঘরে তো স্নিগ্ধা ছাড়া কেউ নেই, তাহলে?? সুরজিৎ স্নিগ্ধাকে দুএকবার ডাকলো, -“স্নিগ্ধা !! শুনছো স্নিগ্ধা!!”
কোনো সারা পেলো না। এইবার সুরজিৎ স্নিগ্ধার গা হাত দিয়ে ডাকতেই স্নিগ্ধা চমকে উঠে বললো, “ও তুমি!! আমি ভাবলাম কে এলো এই সময় আবার এই ঘরে??”
-“আমারও তো সেটাই প্রশ্ন ?? এতো রাতে তুমি মিমির ঘরে বসে কি করছ??”
-“কি করছি মানে??
দেখছো না, মিমিকে ঘুম পারাচ্ছি, কথা বোলো না মিমি উঠে পড়বে।”
-“কি উল্টোপাল্টা বলছো??
কোথায় মিমি…. তুমি কি ভুলে গেছো যে মিমি আর nei ?”
-” তুমি কিসব আজে বাজে কথা বলছো? মিমি তো আমার কোলে মাথা দিয়ে ঘুমোচ্ছে!! Dekhte pa66o na…দেখো মাঝরাতে এইসব ইয়ার্কি আমার একদম ভালো লাগে না।”
স্নিগ্ধা এরপর শূন্যে এমন ভাবে হাত বোলাতে লাগলো যেন সত্যিই মিমি ওর কোলের ওপর শুয়ে আছে আর স্নিগ্ধাও ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে মিমির মাথাতে হাত বোলাচ্ছে…………..
স্নিগ্ধা এরপর সুরজিৎ কে বললো, “যাও তুমি ঘুমিয়ে পরো,নইলে কাল সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারবে না; কাল তো তোমার সকালেই মিটিং আছে। তুমি ঘরে গিয়ে শুয়ে পরো আমি মিমি কে ঘুম পাড়িয়েই আসছি। জানোইতো মেয়েটা একদম ঘুমোতে পারে না আমাকে ছাড়া।”
সুরজিৎ আর কোনো কথা বলতে পারলো না,থমকে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষন। তারপর নিজের ঘরে চলে এলো ….বিছানায় এক পাশ হয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলো.. স্নিগ্ধার তো মনে আছে কাল সকালে আমার মিটিং আছে,তা হলে মিমি যে মারা গেছে সেটা ও ভুলে গেলো কি করে?? অনেক সময় সাংঘাতিক মনের আঘাত থেকেও এমন হয়!! স্নিগ্ধার কি তাহলে এমনটাই হলো?? এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে মনে নেই সুরজিতের।
পরের দিন সকালে যখন সুরজিতের ঘুম ভাঙলো, ও দেখলো স্নিগ্ধা আগেই ঘুম থেকে উঠে তার জন্য ব্রেকফাস্ট বানিয়ে রেখেছে। স্নিগ্ধাকে দেখে সুরজিৎ এর মনেই হলো না যে কাল রাতে স্নিগ্ধা কোনো অস্বাভাবিক আচরণ করছিলো!! সকালে রাতের কোনো কোথায় তুললো না, আর সুরজিৎও ব্রেকফাস্ট করে অফিস এ বেরিয়ে গেলো।
সুরজিৎ ভেবেছিলো যে অফিসের কাজ তাড়াতড়ি শেষ করে স্নিগ্ধাকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাবে, মিমি চলে যাওয়ার পর সারাদিন বাড়িতে একা একা থাকে তাই স্নিগ্ধা হয়তো হ্যালুসিনেট করছে; এই ভেবে সুরজিৎ অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লো।
আজ আবহাওয়াটা একদম যায় ভালো নেই, বৃষ্টি হতে পারে, তার ওপরে রাস্তাতে এতো জ্যাম ছিল যে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে গেলো সুরজিত এর। বাড়িতে ফিরে সুরজিৎ দেখলো যে বাড়ির বাইরে রিনা দাঁড়িয়ে আছে; রিনা সুরজিতের বাড়িতে কাজ করে। রিনা কে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সুরজিৎ বললো, “কিরে তুই বাইরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? স্নিগ্ধা কি কোথাও বেরিয়েছে??”
মেয়েটা যেন খুব ভয় পেয়েছে, কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দিলো, “না দাদাবাবু আমি তো সময়মতো এসে গেছি, এসে দেখি দিদিমনি সব ঘর অন্ধকার করে দিয়ে মিমি দিদির ঘরে গিয়ে বসে আছে র কার সাথে যেন কথা বলছে!! তার ওপরে আবার মোমবাতি জ্বালিয়ে বসে আছে। আমি দিদিমনিকে ডাকতেই দিদিমনি কেমন একটা গলায় বললো
আহ্! বিরক্ত করো না আমায়..নিজের কাজ সেরে বাড়ি চলে যাও
সুরজিৎ রিনার কথা শুনে বললো, “কিসব যাতা বকছিস? চল আমি দেখছি।”
সুরজিৎ ঘরে ঢুকেই আলো জ্বালানোর চেষ্টা করলো, পারলো না। ফিউস গেছে ভেবে অত মাথা ঘামালো না। এখন তার আগে স্নিগ্ধার কাছে যাওয়া প্রয়োজন। এক মুহূর্ত দেরি না করে সুরজিৎ মিমির ঘরের দিকে এগোলো; গিয়ে দেখলো মিমির বার্বি ডল এর সেট টাকে নিয়ে স্নিগ্ধা মেঝেতে বসে মোমবাতি জ্বালিয়ে খেলছে, কথা বলছে গতরাতের মতো আর মেঝের ওপর রাখা মিমির লেখার ডায়েরিটা । সুরজিৎ অনুভব করলো যে মিমির ঘরের হাওয়াটা কেমন যেন ভারী আর তার ওপর তীব্র রজনীগন্ধার সুবাস সারা ঘরে ম ম করছে।
সুরজিৎ এর মনে হলো স্নিগ্ধার গলার স্বরটা বদলে যাচ্ছে; তাহলে কি মিমি সত্যি এই বাড়িতেই আছে?? মিমি কি?? না আর ভাবতে পারছে না সুরজিৎ , মাথা ঝিমঝিম করছে তার।
বাইরেও খুব ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়েছে তার সাথে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে; যেদিন মিমি মারা যায় ঠিক সেইদিনটার মতো। এমন সময় হটাৎ এক দমকা হাওয়া এসে জ্বলন্ত মোমবাতিটাকে এক নিমেষে নিবিয়ে দিলো আর ঠিক সেই সময়েই সুরজিৎ একটা হাসির শব্দ শুনতে পেলো। হাসির শব্দটা সুরজিতের চেনা; হাসিটা মিমির। hihihihihihih
সুরজিৎ এর যখন জ্ঞান ফিরলো তখন ভোর হয়ে গেছে। জ্ঞান ফেরার পর সুরজিৎ দেখলো স্নিগ্ধা তার মাথার কাছে বসে আছে চিন্তিত মুখে!! সুরজিৎ কিছু বলতে চাইলো স্নিগ্ধাকে,পারলো না। প্রচন্ড মাথা ব্যথা করছে সুরজিতের,গতকাল রাতে যখন অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল,তখনই মনে হয় মাথাতে কোনোভাবে ব্যথা পেয়েছিল। গতকাল রাতের ঘটনাটা এখনো যেন ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না সুরজিতের।
এই ঘটনার পর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। এই কয়দিন অফিসে যাওয়ার আগে পর্যন্ত স্নিগ্ধার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করেনি সুরজিৎ, স্নিগ্ধা বেশ স্বাভাবিক আচরনই করছিলো। এখন রিনা সকালে তাদের বাড়িতেই থাকে, কারণ স্নিগ্ধাকে সুরজিৎ একা রাখতে চায় না। সন্ধ্যের পর সুরজিৎ বাড়ি ফিরে এলে রিনা বাড়ি যায়।
এইতো সেই দিনের ঘটনা সুরজিৎ অফিস থেকে সবে মাত্র বাড়ি ফিরেছে, রিনা তখনও বাড়ি যায়নি; সুরজিৎকে দেখেই বললো,
-“দাদাবাবু আমি আর কাল থেকে আসবনা।”
-“কেন? আসবিনা কেন?”
-“দাদাবাবু,দিদিমনি আবার অমন করছে?”
-“অমন করছে মানে?”
-“ওই যে সেই রাতে যেমন করছিলো তেমন,কিন্তু আজকে দিদিমনি মিমি দিদির মতো গলা করে আমার সাথে কথা বললো।”
-” কি উল্টো পাল্টা কথা বলছিস বলতো? দুপুরে খুব ভূতের সিরিয়াল দেখেছিস নাকি?”
-“সত্যি বলছি দাদাবাবু! বিশ্বাস করো আমার কথা।”
-“কি কথা বলেছে স্নিগ্ধা বলতো আমাকে, আমিও শুনি।”
এরপর রিনা দুপুরের ঘটনা বলতে শুরু করে,
-“আমি রান্না করে দিদিমনিকে খেতে ডেকেছি,দিদিমনি খেতেও এলো। তারপর দিদিমনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলো—-“
-“কি রান্না করেছিস আজকে?”
-“আজকে তো কলমি শাক ভাজা আর মাছের ঝোল।”
-“এরপর দিদিমনি মিমি দিদির গলায় আমাকে বললো–“
-“” রিনা দিদি তুমি আবার শাক ভাজা করেছো?তুমি জানোনা আমি শাক ভাজা খাই না। স্কুল থেকে এসে আমি তো টোস্ট আর সূপ খাই, তুমি আমাকে সূপ আর টোস্ট বানিয়ে দাও।””
-“এসব তুমি কি বলছো দিদিমনি? আর তুমি মিমি দিদির মতো করে কথা বলছো কেন?”
-“আমি মিমির মতো করে কথা বলতে যাবো কেন? আমি তো মিমি; তুমি আমাকে চিনতে পারছো না?ও রিনা দিদি তুমি আমাকে চিনতে পারছো না?”
-“এরপর আমি আর কিছু বলতে পারিনি দাদাবাবু; আমি মিমি দিদির মানে দিদিমনির জন্য খাবার বানিয়ে দিয়েছি,দিদিমনি সেটা খেয়ে মিমিদিদির ঘরে বসে খেলছিল। “
কথাগুলো শোনার পর সুরজিৎ আর রিনাকে অবিশ্বাস করতে পারলো না। কারণ কিছুদিন আগের সেই রাতটার কথা মনে পরে গেলো সুরজিতের;সেই রাতেও তো স্নিগ্ধা মিমির ঘর এ বসে খেলছিল আর তাছাড়া মিমির হাসির শব্দ স্পষ্ট শুনেছিলো সুরজিৎ। কি হচ্ছে এসব কিছুই মাথায় আসছে না। কি করবে এখন সুরজিৎ? এই কথা গুলো ভাবতে ভাবতে কখন যে মিমির ঘরের সামনে চলে এসেছে খেয়াল করেনি সুরজিৎ। স্নিগ্ধা মিমির ঘরে বসে আছে,স্নিগ্ধা সুরজিতকে দেখতে পাচ্ছে না কারণ স্নিগ্ধা সুরজিতের দিকে পিঠ করে বসে আছে। স্নিগ্ধা এখন একমনে ডায়েরি লিখছে। সুরজিৎ বেশ অনেক্ষন ধরে পর্যবেক্ষন করছিল স্নিগ্ধাকে, হটাৎই স্নিগ্ধা মিমির মতো করে বলে ওঠে,
-“বাপি তুমি কি দেখছো অমন করে আমার দিকে? ভিতরে এসে বসো; দেখো আমি ডায়েরি লিখছি। সুরজিৎ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে দাঁড়ায়..ডায়েরিটা সুরজিৎ এর মুখের সামনে ধরে স্নিগ্ধা বলে ওঠে …দেখো বাপি আমার এখন আর বেশি বানান ভুল হয় না কারণ মা তো আমার সব বানান ভুলগুলো ঠিক করে দেয়।”
নিজের চোখ আর কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না সুরজিৎ। আর এরপরে কথাটা শোনার জন্য তো একদমই মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল না সুরজিৎ। স্নিগ্ধা এবার নিজের গলাতে ভীষণ অনুরোধের সুরে বললো,
-“প্লিজ সুরজিৎ! মিমি থাকুক না আমাদের কাছে, সেই আবার আগের মতো; শুধু আমরা তিনজন, আর কেউ নয়।”
সুরজিৎ কি বলবে ভেবে পেলো না;ওর গলার স্বর যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। শুধু বললো,
-“বেশতো! থাকুক না মিমি। কিন্তু তুমি যে এতক্ষন না খেয়ে বসে আছো? এতে তো তোমার আরো শরীর খারাপ করবে বোলো? চলো খেয়ে নেবে চলো। রিনা তোমার জন্য খাবার রেখে গেছে, চলো খেয়ে নেবে চলো।”
এরপর স্নিগ্ধা সুরজিতের কথা মতো গিয়ে খাবার খেয়ে নিলো তারপর শুয়েও পড়লো।
এরপর কয়েকমাস কেটে গেছে। সুরজিৎ স্নিগ্ধাকে একজন বড়ো psychiatrist কে দিয়ে ট্রিটমেন্ট করিয়েছে। স্নিগ্ধাকে দেখানোর পর তিনি বলেন যে মিমির মৃত্যুটা স্নিগ্ধা মেনে নিতে পারছিলো না তাই স্নিগ্ধা মিমির স্মৃতি গুলোকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছিলো; আর মিমির মতো আচরণ করছিল।মিমির সেই ডায়েরিটা! যার শেষ পাতাগুলো এখনো খালি; তার মধ্যে কোনোদিনই কিছু লেখা ছিল না, স্নিগ্ধা নিজের মনের মতো বানিয়ে বলেছিলো এসব। ডাক্তারি ভাষায় এই অসুখের একটা নাম আছে… সুরজিৎ স্নিগ্ধাকে বুঝিয়েছে, সে যেন আবার লেখাটা শুরু করে। মিমি তার লেখার মধ্যেই বেঁচে থাকবে।
সুরজিতের বাড়ি এখন আবার আগের মতো স্বাভাবিক,স্নিগ্ধা এখন অনেক সুস্থ।স্নিগ্ধা আবার গল্প লিখতে শুরু করেছে। আর তার সাথে ডায়েরিও লেখে। সুরজিৎ বারণ করে না। স্নিগ্ধা এখন একটা অনাথ আশ্রমে যায় রবিবার করে; সেখানে বাচ্ছাগুলোর সাথে সময় কাটাতে ভালোলাগে ওর। সুরজিতও যায় মাঝে মাঝে স্নিগ্ধার সাথে। বাচ্চা ছেলেমেয়ে গুলোর মধ্যেই মিমিকে খুঁজে পায় দুজনে।
