অভিশপ্ত যাত্রা | Abhisapta Yatra

Abhisapta Yatra written by Debanshu Ghosh
সেদিন ছিল শুক্রবার। অফিসের কাজ শেষ করে আমরা পাঁচজন বন্ধু মিলে একটা ছোট রোড ট্রিপের প্ল্যান করেছিলাম। আমি বিশ্বজিৎ, আমার বন্ধু অভিজিত আর তার স্ত্রী সুচরিতা, আরেক বন্ধু অনির্বাণ এবং রিয়া। হাওড়া থেকে বাঁকুড়া যাওয়ার প্ল্যান ছিল আমাদের। পথে কামারপুকুর জয়রামবাটি হয়ে বাঁকুড়া। অভিজিতের নতুন গাড়িতে আমরা রওনা দিলাম রাত আটটা নাগাদ।
“কি রে বিশ্বজিৎ, রাস্তাটা ঠিক মতো চিনিস তো?” অভিজিত গাড়ি চালাতে চালাতে জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ, কোণা এক্সপ্রেসওয়ে ধরে যাব। রাতে রাস্তাটা খুব ফাঁকা থাকে, দ্রুত পৌঁছে যাব,” আমি জবাব দিলাম।
গাড়িতে হালকা গান চলছিল। আমরা সবাই খুব ভালো মেজাজে ছিলাম। গাড়ি ছুটে চলেছে বিদ্যুতের গতিতে। বিশেষ করে সবার আগ্রহ ছিল কালীপ্রসন্ন বাবুর বাড়িতে যাওয়ার। অভিজিতের শ্বশুরবাড়ির কাছে থাকেন ভদ্রলোক। তন্ত্র-মন্ত্র নিয়ে গবেষণা করেন, নাকি অনেক অলৌকিক ঘটনা নিয়ে লিখেন।
গাড়িতে আমরা পাঁচজন ছাড়াও ছিল অনির্বাণের কাছে সংগৃহীত দু’বোতল স্কচ হুইস্কি। “রাতের হালকা শীতে একটু গরম হওয়া দরকার,” এই বলে সে অনির্বাণ গাড়ি থামাতে বলল।
রাত তখন প্রায় দশটা। এক্সপ্রেসওয়ের পাশে একটি ছোট চায়ের দোকানে গাড়ি থামালাম আমরা। জায়গাটা বেশ নির্জন, শুধু দূরে দু-একটা ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। চায়ের দোকানের মালিক মুচকি হেসে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন।
“আসুন, আসুন। রাতের এই সময় ভাল লোক পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার,” বলল সে। আমরা চায়ের অর্ডার দিলাম, এবং লোকজন নাথাকায় দোকানদারের সাথে কথা বলতে লাগলাম। কথায় কথায় জানতে পারলাম দোকানের মালিকের নাম দুর্গাপ্রসাদ।
সুচরিতা অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। “আমার টয়লেট যেতে হবে,” বলল সে অভিজিতকে।
দুর্গাপ্রসাদ হাত দিয়ে ইশারা করে বলল, “ওদিকে, পিছনে কিছু গাছপালা আছে। সেখানে গেলেই হবে। অন্য কোন সুবিধা এখানে নেই।”
সুচরিতা অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে গেল। তার লম্বা চুল খোলা ছিল, হালকা বাতাসে উড়ছিল।
মিনিট দশেক পরে সুচরিতা ফিরে এল, কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম যে তার চোখে একটা অদ্ভুত চাউনি। সে কারো সঙ্গে কথা বলছিল না, শুধু চুপচাপ বসে রইল। আমরা চা শেষ করে গাড়িতে উঠলাম।
এবার আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম। মাত্র ১০-১২ মিনিট যাওয়ার পর হঠাৎ পিছন থেকে এক অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেলাম।
“আমাকে ছেড়ে দাও! আমি যেতে চাই! ” সুচরিতার কণ্ঠ, কিন্তু সেটা তার নিজের গলা বলে মনে হল না। বেশ গম্ভীর, ভারী একটা আওয়াজ।
অভিজিত ঘাবড়ে গেল। “সুচু, কি হয়েছে? কি বলছিস তুই?”
সুচরিতা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, এমন জোরে যে আমার হাত কেঁপে গেল। গাড়ি একপাশে নিয়ে থামালাম।
ফিরে দেখি সুচরিতার চোখ বিস্ফারিত, চুল উস্কো-খুস্কো। সে তার নিজের নখ দিয়ে হাত আঁচড়াচ্ছে। অভিজিত তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে, কিন্তু সুচরিতা তখন অন্য কোন জগতে।
“কি হচ্ছে এটা?” রিয়া ভয়ে কাঁপতে শুরু করল।
সুচরিতা হঠাৎ কাশতে শুরু করল, এমনভাবে যেন তার গলায় কিছু আটকে গেছে। তারপর সে হিসহিস করে বলতে লাগল কিছু, যা আমরা কোনভাবেই বুঝতে পারছিলাম না।
“আমার মনে হয় ওর শরীরে কিছু একটা ঢুকেছে,” অনির্বাণ ফিস ফিস করে বলল।
হঠাৎ করে অভিজিতের একটা ঝাকুনিতে সুচরিতার মুখের এক্সপ্রেশন পুরোপুরি বদলে গেল। সে শান্ত হয়ে গেল, সেই আগের সুচরিতা। “কি হল? তোমরা সবাই আমার দিকে অমন করে তাকাচ্ছ কেন?”
আমরা কেউই কিছু বলতে পারলাম না।
আবার যাত্রা শুরু করলাম, কিন্তু গাড়ির ভেতরটা অস্বস্তিকর নীরবতায় ভরে উঠল। সুচরিতা আবার স্বাভাবিক আচরণ করছিল, কিন্তু আমরা সবাই সতর্ক ছিলাম।
হঠাৎ সুচরিতা গান গাইতে শুরু করল – একটা পুরনো বাংলা গান, যার কথাগুলো ছিল অদ্ভুত, বিষণ্ণ। আমরা কেউ সেই গান আগে শুনিনি।
“সুচু, তুই এই গান শিখলি কোথা থেকে?” অভিজিত জিজ্ঞেস করল।
সে জবাব দিল না, শুধু গান চালিয়ে গেল। তারপর হঠাৎ গান থামিয়ে সে চিৎকার করে উঠল, এবার এত জোরে যে আমি আবার গাড়ি থামাতে বাধ্য হলাম।
অভিজিত সুচরিতাকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু সে অসাধারণ শক্তিতে তাকে ধাক্কা দিল। সুচরিতা খুব সরু, ছিপছিপে মেয়ে, কিন্তু সে অভিজিতকে এমন জোরে ধাক্কা দিল যে সে গাড়ির দরজায় আছড়ে পড়ল।
আমার মাথায় হঠাৎ হনুমান চালিশা পড়ার কথা মনে পড়ল। রিয়া আর প্রতীক সুচরিতাকে ধরে রাখার চেষ্টা করছিল, আর আমি জোরে জোরে হনুমান চালিশা আবৃত্তি করতে শুরু করলাম।
“জয় হনুমান জ্ঞান গুণ সাগর, জয় কপীশ তিহুঁ লোক উজাগর…”
আশ্চর্যজনকভাবে, সুচরিতা শান্ত হতে শুরু করল। সে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ল, যেন কেউ তার শক্তি শুষে নিচ্ছে।
কিন্তু আমি যেই আবৃত্তি থামালাম, সে আবার চিৎকার করতে শুরু করল। এবার অভিজিত সুচরিতার হাত ধরে দেখল যে তার শরীরে লাল লাল দাগ উঠছে, যেন কেউ তাকে নখ দিয়ে আঁচড়েছে।
সুচরিতাকে এভাবে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব ছিল। আমরা অনেক ভেবে আশেপাশে কোনো লোকালয় খুঁজছিলাম। তখন রাত প্রায় বারোটা বেজে গেছে।
দূরে একটা আলো দেখতে পেলাম। এগিয়ে গিয়ে দেখি একটা ছোট মসজিদ, সেখানে আলো জ্বলছে।
“চল, ওখানে যাই। হয়তো কেউ সাহায্য করতে পারবে,” আমি বললাম।
মসজিদের গেটে পৌঁছানোর সময় সুচরিতা আবার চিৎকার করতে শুরু করল, এবার আরও জোরে। তার গলা থেকে বেরোনো আওয়াজ শুনে মনে হল কয়েকজন একসাথে চিৎকার করছে।
আমরা সবাই মিলে তাকে ধরে টেনে মসজিদের ভেতরে নিয়ে গেলাম। কিন্তু ভেতরে গিয়ে আশ্চর্য হলাম – আলো জ্বলছে, কিন্তু কেউ ছিল না।
“কেউ আছেন? সাহায্য করুন!” অনির্বাণ চিৎকার করল।
কয়েক মিনিট পর একজন বয়স্ক লোক এলেন। তিনি নিজেকে হাজি আবদুল করিম বলে পরিচয় দিলেন।
“কি হয়েছে বাবারা? এত রাতে…” তিনি জিজ্ঞেস করলেন। তারপর সুচরিতাকে দেখে তার চোখ বড় হয়ে গেল। “এটা কী হয়েছে?”
আমরা দ্রুত সব ঘটনা বললাম। হাজি সাহেব মাথা নেড়ে বললেন, “বাছা, এ তো খারাপ জিনিস ধরেছে। এখানে এনে তোমরা ভালোই করেছ। কিন্তু এর সম্পূর্ণ ইলাজ আমার জানা নেই। তবে বেটি কিছুটা শান্ত হবে। “
তিনি কোরান শরিফ পাঠ করতে শুরু করলেন। সুচরিতার কষ্ট হচ্ছিল বোঝা যাচ্ছিল, সে ছটফট করছিল। হাজি সাহেব প্রায় আধা ঘন্টা ধরে প্রার্থনা করলেন। ধীরে ধীরে সুচরিতা শান্ত হল এবং ঘুমিয়ে পড়ল।
হাজি সাহেব বললেন, “এখন তোমরা যাও। কিন্তু এটা সাময়িক শান্তি। ওকে যে ধরেছে, তা খুব শক্তিশালী। তোমরা কোন বড় তান্ত্রিক বা ওঝার কাছে নিয়ে যাও ওকে, কিন্তু খুব তারাতারি আর খুব সাবধানে।”
ঘুমন্ত সুচরিতাকে নিয়ে আমরা গাড়িতে উঠলাম। তখন প্রায় ঘড়ির কাটা রাত ২টো ছুঁই ছুঁই । আমরা বাঁকুড়া যাওয়ার পরিকল্পনা ছেড়ে কলকাতা ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম।
“কালীপ্রসন্ন বাবুকে ফোন করতে হবে, কিন্তু এই মুহূর্তে আমার মনে হয় বাড়ি ফেরাই উচিত” অভিজিত বলল।
আমরা হাওড়ার দিকে রওনা দিলাম। গাড়িতে নীরবতা। রিয়া ঘুমিয়ে পড়েছিল, অভিজিত সুচরিতার পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলাচ্ছিল। অনির্বাণ আমার পাশে বসে নীরবে বাইরে তাকিয়ে ছিল।
হাওড়া ব্রিজের উপর যখন আমাদের গাড়ি, হঠাৎ সুচরিতা জেগে উঠল। কিন্তু যে চোখ খুলল, সেটা সুচরিতার চোখ ছিল না। ভয়ংকর, রক্তাম্বর দুটো চোখ আমাদের দিকে তাকাল।
“তোমরা আমাকে পালাতে দিচ্ছ না কেন?” এক ভারী কণ্ঠে সে বলল। “ঠিক আছে, তবে, তোমাদের সবাইকে আমার সঙ্গে নিয়ে যাব!”
সে হঠাৎ স্টিয়ারিং হুইল ধরে টানতে শুরু করল। ব্রিজের উপর গাড়ি দুলতে শুরু করেছে। আমি কোনোমতে গাড়ি সামলে নিলাম, কিন্তু সুচরিতার শক্তি অসম্ভব ছিল।
অভিজিত আর অনির্বাণ দুজনে মিলে সুচরিতাকে ধরে রাখার চেষ্টা করল। রিয়া ভয়ে কাঁদতে শুরু করেছে। অনির্বাণ আমাকে গাড়ি দ্রুত চালাতে বলল।
“আমাদের কাছে আর কোন উপায় নেই,” আমি চিৎকার করে বললাম। “কালীপ্রসন্ন বাবুকে ফোন করতে হবে!”
আমি দ্রুত ফোন বের করে কালীপ্রসন্ন বাবুর নম্বরে কল করলাম। অনেকবার চেষ্টার পর তিনি ফোন ধরলেন।
“কে? এত রাতে?” তার ক্ষীণ কণ্ঠ ভেসে এল।
“আমি বিশ্বজিৎ, অভিজিতের বন্ধু। আমরা সংকটে পড়েছি, সুচরিতার কিছু হয়েছে…” আমি দ্রুত ঘটনা বলছিলাম, এমন সময় সুচরিতা আমার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
ব্রেক কষলাম, গাড়ি পাশে নিয়ে। সুচরিতা আমাকে আক্রমণ করার চেষ্টা করছিল, অন্যরা তাকে কষ্টে ধরে রেখেছিল।
“কালীপ্রসন্ন বাবু! সাহায্য করুন!” আমি ফোনে চিৎকার করলাম।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “শোন, এখনই তোমরা আমার বাড়ি চলে এসো। আমি বারাসাতের নতুন বাড়িতে আছি। রাস্তা জানো তো?”
“হ্যাঁ জানি। আমরা আসছি।”
“আর শোন, রাস্তায় কোনো মন্দির বা ধর্মীয় স্থান পেলে সেখানে থামবে না। সোজা আমার বাড়ি চলে এসো।”
গাড়ি আবার চালাতে শুরু করলাম। সুচরিতা এখন আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল, কিন্তু তার নিঃশ্বাস অস্বাভাবিক ছিল। মাঝে মাঝে সে বিড়বিড় করে কি যেন বলছিল, এক অজানা ভাষায়।
“সুচরিতার গায়ে দাগগুলো বাড়ছে,” রিয়া ফিসফিস করে বলল।
দেখলাম, সত্যিই সুচরিতার হাত, ঘাড়, মুখে লাল লাল দাগ, যেন কেউ তাকে আঁচড়ে দিয়েছে।
অভিজিতের চোখে জল। “সুচরিতার কি হবে?” সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
“চিন্তা করিসনা, কালীপ্রসন্ন বাবু সাহায্য করবেন,” আমি বললাম, যদিও আমার নিজের ভেতরেও ভয় কাজ করছিল।
বারাসাত যাওয়ার পথে সুচরিতা আরও দু’বার জেগে উঠল। প্রথমবার সে হিন্দিতে কথা বলতে শুরু করল, যদিও সে কখনও হিন্দিতে স্বচ্ছন্দ ছিল না। দ্বিতীয়বার সে শুধু হাসতে লাগল, অদ্ভুত, উচ্চ শব্দে।
সূর্য ওঠার কিছু আগে আমরা কালীপ্রসন্ন বাবুর বাড়ি পৌঁছে গেলাম। ভোরের আলোয় দেখলাম, একটি পুরনো বাড়ি, চারপাশে বাগান। কালীপ্রসন্ন বাবু গেটে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
“নিয়ে এসো, এদিকে নিয়ে এসো ওকে,” কালীপ্রসন্ন বাবু ইশারা করলেন।
আমরা সুচরিতাকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে গেলাম। তিনি আমাদের একটি বড় ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরটি লাল রঙের কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল, কালী মায়ের বড় একটি মূর্তি ছিল এক কোণে।
“ওকে এখানে শুইয়ে দাও,” তিনি নির্দেশ করলেন।
আমরা সবাই ক্লান্ত ছিলাম, রাতভর না ঘুমিয়ে। কালীপ্রসন্ন বাবু আমাদের জন্য জল ও চা আনতে বললেন তাঁর চাকরকে ডেকে।
“তোমরা বিশ্রাম নাও, আমি সুচরিতাকে দেখছি” তিনি বললেন।
তিনি ঘরে তালা দিয়ে আমাদের বাইরে বসতে দিলেন। আমরা বারান্দায় বসে রইলাম। ভেতর থেকে মন্ত্র পাঠের শব্দ আসতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর ভয়ানক চিৎকার শুনতে পেলাম। সুচরিতার কণ্ঠ, কিন্তু সেটা সে নয়, যেন কেউ তার ভেতর থেকে চিৎকার করছে।
অভিজিত উঠে দাঁড়াল, কিন্তু অনির্বাণ তাকে ধরে রাখল। “থাম। কালীপ্রসন্ন বাবু আমাদের ওদিকে যেতে বারণ করেছেন, ভুলে গেলি। তিনি ওকে ঠিক করে দেবেন। একটু ধৈয্য ধর”
প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে এই অবস্থা চলল। মাঝে মাঝে আমাদের চা জলখাবার দিয়ে গেল কালীপ্রসন্ন বাবুর চাকর রামদুলাল, কিন্তু কেউই ঠিক মতো ঘুমাতে পারছিলাম না। ঘর থেকে বিভিন্ন শব্দ আসছিল – কখনও মন্ত্র পাঠ, কখনও চিৎকার, আবার কখনও কান্না।
প্রায় ঘন্টা দুই পর ঘরের দরজা খুলে গেল। কালীপ্রসন্ন বাবু বেরিয়ে এলেন, তার চেহারা ক্লান্ত, কিন্তু চোখে শান্তি।
“ভয় নেই,” তিনি বললেন। “সুচরিতা, সুচরিতা এখন ভালো আছে।”
আমরা ঘরে গেলাম। সুচরিতা বিছানায় শুয়ে ছিল, মুখ ফ্যাকাশে, কিন্তু শান্ত। অভিজিত তার কাছে গিয়ে বসল।
“কি হয়েছিল ওর?” রিয়া জিজ্ঞেস করল।
কালীপ্রসন্ন বাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তোমরা যে এক্সপ্রেসওয়ে ধরে যাচ্ছিলে, সেখানে কয়েক বছর আগে এক ভয়ানক দুর্ঘটনা হয়েছিল। একটি ছোট মেয়ের মৃত্যু হয়েছিল, খুব করুণ অবস্থায়। তার আত্মা শান্তি পায়নি।”
“আর সেই কি সুচরিতাকে ধরেছিল?” অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ। তোমরা যে কথা বলেছিলে, সেই চায়ের দোকানের মালিক দুর্গাপ্রসাদ – সে ভালো লোক নয়। সে এই ধরনের ঘটনা ঘটায়। নতুন গাড়ি দেখে সে বুঝতে পেরেছিল তোমরা বাইরের লোক। তোমাদের থেকে টাকা আদায় করার জন্য সে এই ঘটনা ঘটিয়েছিল।”
“কিন্তু কিভাবে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“সে তার দোকানের পিছনে যে জায়গা দেখিয়েছিল, সেখানেই কোথাও ওই মেয়েটির আত্মা ছিল। দুর্গাপ্রসাদ এখন সেই আত্মাকে ব্যবহার করে লোকেদের সাহায্য করার নাম করে টাকা আদায় করে। চায়ের সঙ্গে সে একটি বিশেষ ধরনের ভেষজ পদার্থ মিশিয়ে দেয়, যা সেই আত্মাকে আকর্ষণ করে। তার মধ্যে সুচরিতার চুল খোলা ছিল।”
“লম্বা খোলা চুল আত্মার আকর্ষণ করে। তাছাড়া, কাল অমাবস্যা ছিল । এই সব কারণে আত্মা সুচরিতার শরীরে প্রবেশ করতে পেরেছিল।”
আমরা সবাই স্তব্ধ হয়ে শুনছিলাম।
“কিন্তু এখন? এখন সে ভালো আছে তো?” অভিজিত উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ, আমি ওকে মুক্ত করেছি। ওই আত্মাকেও শান্তি দিয়েছি। সে এখন মুক্ত।”
সুচরিতা ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তার চোখে কষ্টের ছাপ, কিন্তু সেটা আবার সেই চেনা সুচরিতার চোখ।
“অভি…” সে ক্ষীণ স্বরে ডাকল।
অভিজিত তার হাত ধরল। “আমি এখানে আছি। তুমি এখন ভালো আছো।”
সুচরিতা উঠে বসার চেষ্টা করল। কালীপ্রসন্ন বাবু তাকে একটি কাপে কিছু জল দিলেন।
“কিছু মনে আছে?” কালীপ্রসন্ন বাবু জিজ্ঞেস করলেন।
সুচরিতা মাথা নাড়ল। “কিছু কিছু। যেন ভেতরে আমি ছিলাম, কিন্তু আমার শরীর আমার নিয়ন্ত্রণে ছিল না। একটা মেয়ে একটা মেয়ে… তার নাম অন্বেষা। সে খুব কষ্টে ছিল।”
কালীপ্রসন্ন বাবু গম্ভীর হয়ে গেলেন। “হ্যা, তার নাম অন্বেষা ছিল। প্রায় ১০ বছর আগে সেই এক্সপ্রেসওয়েতে তার দুর্ঘটনা হয়। সে একটি ট্রাকের নীচে পড়ে যায়। তার প্রেমিক তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তাই সে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।”
“সে আমার মাধ্যমে কি চাইছিল?” সুচরিতা ক্ষীণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
“সে চাইছিল যাতে তার প্রেমিককে খুঁজে বের করা হয়। সে চাইছিল প্রতিশোধ নিতে।”
“কিন্তু আমি তো জানতাম না তার প্রেমিক কে!”
“এটাই সমস্যা। আত্মারা এটা বোঝে না। তারা শুধু তাদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যে কাউকে ব্যবহার করতে চায়। আর এই কাজে তাকে সাহায্য করে, সেই চায়ের দোকানের মালিক, তবে সেটা সে কেন করে, টাকার জন্য না অন্য কারণে, সেটা আমি, সঠিক বলতে পারবো না “
কিছুক্ষন সুচরিতা ঘুমিয়ে পড়ল। আমরা সবাই কালীপ্রসন্ন বাবুর বাড়িতে রাতটা কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। তিনি আমাদের জন্য খাবার এবং শোবার ব্যবস্থা করলেন।
রাতে খাবার টেবিলে কালীপ্রসন্ন বাবু আমাদের এক অদ্ভুত কাহিনী শোনালেন।
“দুর্গাপ্রসাদ আসলে একজন তান্ত্রিক । সে নিজের স্বার্থে অনেক মানুষকে ব্যবহার করে। বহু দিন আগের কথা, সে তার নিজের মেয়েকেও বলি দিয়েছিল শক্তি পাওয়ার জন্য।”
আমরা সবাই শিউরে উঠলাম।
“আমি পুলিশকে খবর দিয়েছি এবং সব কিছু বলেছি। এখন তারা দুর্গাপ্রসাদকে খুঁজছে।”
পরদিন সকালে কালীপ্রসন্ন বাবু আমাদের একটি চিঠি দিলেন। “এটা অবশ্যই পড়বে,” তিনি বললেন।
চিঠিটা অদ্ভুত কাগজে লেখা, হাতে লেখা চিঠি, কিন্তু যেন স্পষ্ট নয়। আমি পড়লাম:
“আমার নাম অন্বেষা। আমি দুঃখিত যে আমি তোমাদের কষ্ট দিয়েছি। আমি শুধু শান্তি চাইছিলাম। আমার প্রেমিক আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তাই আমি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু তারপরও আমি শান্তি পাইনি। দুর্গাপ্রসাদ আমার আত্মাকে আটকে রেখেছিল। সে আমাকে ব্যবহার করত লোকেদের ভয় দেখাতে, তারপর তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করত ‘রক্ষা’ করার নাম করে। আমি মুক্তি চাইছিলাম। সুচরিতা, তোমার সাহায্যে আমি তা পেয়েছি। কালীপ্রসন্ন বাবু আমাকে মুক্তি দিয়েছেন। আমি এখন শান্তিতে যেতে পারি।”
সেই দুপুরে আমরা কালীপ্রসন্ন বাবুর বাড়ি থেকে বিদায় নিলাম। তিনি সুচরিতাকে একটি তাবিজ দিলেন। “এটা পরে থেকো। এটা তোমাকে রক্ষা করবে,” তিনি বললেন।
“আমরা কি সেই চায়ের দোকানটা ও তার মালিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করব?” অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল।
“না,” কালীপ্রসন্ন বাবুর দৃঢ় স্বরে বলল। “পুলিশ ওই দুর্গাপ্রসাদকে খুঁজে বের করবে। তোমাদের আর সেখানে যাওয়ার দরকার নেই।”
সুচরিতা চুপ করে বসে ছিল। তার হাতে এখনও সেই আঁচড়ের দাগ ছিল।
“তোমরা জানো, আমি যখন ওই আত্মার দ্বারা আক্রান্ত ছিলাম, তখন আমি কিছু অনুভব করেছিলাম,” সুচরিতা ধীরে ধীরে বলল। “আমি অন্বেষার যন্ত্রণা অনুভব করেছিলাম। সে আসলে একটি ভালো মেয়ে ছিল, কিন্তু পরিস্থিতি তাকে এমন করে তুলেছিল।”
“তুই কি দেখতে পেয়েছিলে তার জীবন?” রিয়া জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ…,” তখনি কালীপ্রসন্ন বাবু উচ্চ কণ্ঠে বললেন “থামো তোমরা,সুচরিতা এখনো সুস্থ নয়, ও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাক তারপর ওর থেকে সব শুনো। তোমরা এখন বাড়ি যাও। আর হ্যা , অভিজিত, তুমি সুচরিতা খেয়াল রেখো।”
তারপর আমরা সবাই চুপচাপ গাড়িতে বসে বাড়ির দিকে রোহন দিলাম।

