আলোর পথে | Alora Pathe

Alora Pathe written by Debanshu Ghosh
আজ আমি যে গল্পটা বলতে চলেছি, সেটা শুধু একটা গল্প নয়। এটা একটা সংগ্রামের ইতিহাস, একটা পরিবারের যন্ত্রণার কাহিনী, এবং সবচেয়ে বড় কথা – এটা একটা জীবন্ত প্রমাণ যে অন্ধকারের শেষে আলো আছে। এই গল্পটা আমার ছেলে অর্ণবের। আমার একমাত্র সন্তান, আমার ধ্যান, আমার জীবনের অর্থ।
অর্ণব যখন ছোট ছিল, তখন সে ছিল একদম সাধারণ একটা ছেলে। না খুব মেধাবী, না একদম দুর্বল। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা একটা সাধারণ ছেলে। আমার স্বামী একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতেন, বেতন ছিল মাসে পনেরো হাজার টাকা। আর আমি ছিলাম গৃহিণী। হাওড়ার এক ছোট্ট ফ্ল্যাটে আমাদের তিনজনের সংসার। কোনো বড় স্বপ্ন ছিল না, শুধু একটাই চাওয়া – আমার ছেলে যেন ভালো মানুষ হয়, ভালো পড়াশোনা করে একটা সুপ্রতিষ্ঠিত জীবন গড়তে পারে।
অর্ণব যখন ক্লাস ফাইভে পড়ত, তখন আমরা একটা বড় সিদ্ধান্ত নিলাম। বাংলা মাধ্যম স্কুল থেকে তাকে একটা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করাব। আশেপাশের সবাই বলত, ইংরেজি মাধ্যমে পড়লে ছেলের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে। চাকরি-বাকরিতে সুবিধা হবে। আমরাও ভাবলাম, আমরা যা পারিনি, ছেলে হয়তো পারবে।
সেই স্কুলটা ছিল আমাদের এলাকার সবচেয়ে নামকরা ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। ভর্তির জন্য আমার স্বামী অনেক ছোটাছুটি করলেন। ডোনেশন দিতে হল পঞ্চাশ হাজার টাকা। সেই টাকা জোগাড় করতে আমরা আমাদের সামান্য জমানো টাকা, কিছু ধার, এবং আমার গয়না বিক্রি করে দিলাম। কিন্তু মনে কোনো দুঃখ ছিল না। মনে হচ্ছিল, ছেলের জন্য এটা একটা কর্তব্য।
অর্ণবের স্কুলের প্রথম দিনটা এখনও মনে পড়ে। সে নতুন ইউনিফর্ম পরে, নতুন ব্যাগ নিয়ে কতটা খুশি ছিল! আমি তার হাত ধরে স্কুলের গেটে নিয়ে গিয়েছিলাম। বড় বড় গাড়িতে অন্য বাচ্চারা আসছিল। আমরা গিয়েছিলাম অটোয়। সেদিন সব কিছু সাধারণই ছিল।
প্রথম কয়েক মাস ভালোই কাটল। অর্ণব স্কুল থেকে ফিরে আসত, বলত ক্লাসের গল্প। কিন্তু আস্তে আস্তে আমি লক্ষ্য করতে শুরু করলাম, ওর মধ্যে একটা পরিবর্তন আসছে। স্কুলে যেতে আর আগের মতো আগ্রহ নেই। সকালে ঘুম থেকে ওঠাতে গেলে নানা অজুহাত দেখায়।
একদিন জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে অর্ণব? স্কুলে কি কোনো সমস্যা হচ্ছে?”
ও মাথা নাড়ল, “না মা, কিছু না।”
কিন্তু মায়ের হৃদয় তো মিথ্যা বলে না। আমি বুঝতে পারছিলাম, কিছু একটা গণ্ডগোল হচ্ছে।
আস্তে আস্তে সত্যিটা বেরিয়ে আসতে শুরু করল। অর্ণব যে ক্লাসে পড়ত, সেখানে বেশিরভাগ বাচ্চাই ছিল ধনী পরিবারের। তাদের বাবারা ছিলেন বড় ব্যবসায়ী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার। তারা দামি গাড়িতে স্কুলে আসত, দামি জুতো-জামা পরত, দামি লাঞ্চ বক্স নিয়ে আসত।
অর্ণবের ছিল সাধারণ জুতো, সাধারণ ব্যাগ। লাঞ্চে আমি যা দিতাম – রুটি-সবজি, ডিম, ভাত – সেগুলো নিয়ে ক্লাসের কিছু ছেলে হাসাহাসি করত। একদিন ও বাড়ি ফিরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “মা, আমার লাঞ্চ বক্স খুলে দেখে রাহুল বলল, ‘ছি, এসব কী খাস? আমার মা তো আমাকে টিফিনে পিৎজা এবং পাস্তা এই সব করে দেয় ।'”
সেদিন আমার বুকটা ফেটে গেল। আমি জানি, আমি সবচেয়ে ভালো খাবারটাই ছেলেকে দিচ্ছি যা আমার সাধ্যে কুলোয়। কিন্তু এই বাচ্চাগুলো তো সেটা বুঝবে না।
শুধু খাবার নয়, পড়াশোনাতেও ভেদাভেদ শুরু হল। অর্ণবের ইংরেজি ততটা ভালো ছিল না। সে বাংলা মাধ্যম থেকে এসেছিল, তাই ইংরেজিতে কথা বলতে, লিখতে অসুবিধা হত। কিন্তু যেসব বাচ্চা ছোটবেলা থেকেই ইংরেজি মাধ্যমে পড়ছিল, তাদের কাছে সব সহজ।
ক্লাসে শিক্ষকরাও পার্থক্য করতেন। যে ছেলেমেয়েরা ভালো নম্বর পেত, যাদের বাবা-মায়েরা স্কুলে এসে শিক্ষকদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলত, তাদের প্রতি শিক্ষকদের আলাদা নজর থাকত। আর অর্ণবের মতো মাঝারি ছাত্রদের প্রতি? তাদের দিকে তাকানোর সময়ই ছিল না শিক্ষকদের।
ক্লাস সিক্সে উঠে অবস্থা আরও খারাপ হতে শুরু করল। অর্ণব যে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছিল, সেটা আমরা বুঝতে পারছিলাম। পরীক্ষায় নম্বর কমতে শুরু করল। প্রথমে সে ক্লাসে মাঝামাঝি পজিশনে থাকত, পরে নিচের দিকে নামতে শুরু করল।
শিক্ষকরা প্যারেন্টস মিটিংয়ে বলতেন, “আপনার ছেলে মনোযোগ দেয় না। ক্লাসে অন্যমনস্ক থাকে।” কিন্তু কেন মনোযোগ দেয় না, সেটা কেউ জানতে চাইত না। কেউ বুঝতে চাইত না যে, যখন ক্লাসে অন্য বাচ্চারা তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে, যখন শিক্ষক তোমার প্রশ্নের উত্তর দেন না কারণ তুমি “দুর্বল ছাত্র”, তখন মনোযোগ দেওয়া কত কঠিন হয়ে যায়।
অর্ণব ক্রমশ ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে বসতে শুরু করল। সামনের বেঞ্চগুলো ছিল “ভালো ছাত্রদের” জন্য। ওরা প্রশ্ন করত, শিক্ষকরা খুশি হয়ে উত্তর দিতেন। পেছনের বেঞ্চে যারা বসত, তারা ছিল অদৃশ্য।
আমরা তখন একটা প্রাইভেট টিউটর রাখলাম অর্ণবের জন্য। সেই টিউটর মাসে নিতেন পাঁচ হাজার টাকা। আমাদের বাজেটের জন্য এটা ছিল একটা বড় খরচ। আমার স্বামী অফিসে অতিরিক্ত কাজ নিতে শুরু করলেন। আমি বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ নিলাম।
কিন্তু টিউশনেও একই সমস্যা। সেই টিউটরের কাছে আরও পাঁচ-ছয়জন ছাত্র পড়ত। তাদের মধ্যে যারা ভালো, তাদের প্রতি বেশি মনোযোগ। অর্ণব বলত, “স্যার, আমার দিকে তাকান না মা। আমি প্রশ্ন করলে বলেন, ‘এটা তো অনেক সহজ, এটাও বুঝিস না?'”
ক্লাস সেভেনে উঠে অর্ণবের জীবনে আরেকটা বিপদ এল – বুলিং। ক্লাসের কয়েকজন ছেলে, যাদের বাবারা ছিলেন খুব ধনী এবং প্রভাবশালী, তারা অর্ণবকে টার্গেট করতে শুরু করল।
প্রথমে ছিল মৌখিক বুলিং। “গরিব”, “পিছিয়ে পড়া”, “বোকা” – এমন সব নাম ওরা ডাকত। অর্ণবের জুতো, ব্যাগ, এমনকি পেন্সিল বক্স নিয়েও মজা করত।
তারপর শুরু হল শারীরিক বুলিং। স্কুলের করিডরে ধাক্কা দেওয়া, লাঞ্চের সময় খাবার ফেলে দেওয়া, বইপত্র ছিঁড়ে ফেলা। একদিন অর্ণব বাড়ি ফিরল, তার শার্টে কালির দাগ। জিজ্ঞেস করতেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
আমি পরদিন স্কুলে গিয়ে শিক্ষকদের সাথে কথা বললাম। কিন্তু যে ছেলেরা বুলিং করছিল, তাদের বাবারা ছিলেন স্কুলের ম্যানেজিং কমিটিতে। ফলাফল? কিছুই হল না। বরং শিক্ষিকা বললেন, “বাচ্চারা তো একটু মজা করে। আপনার ছেলে হয়তো একটু বেশি সেনসিটিভ।”
সেদিন আমার ভীষণ রাগ হয়েছিল। কিন্তু কী করতে পারতাম? আমরা তো সাধারণ মানুষ। আমাদের কথার কোনো দাম নেই।
অর্ণব আস্তে আস্তে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করল। স্কুলে যেতে অসম্ভব অনিচ্ছা। সকালে ওকে জোর করে তুলতে হত। অনেক সময় পেট ব্যথা, মাথা ব্যথার অজুহাত দেখাত। আমি বুঝতে পারতাম এগুলো অজুহাত, কিন্তু ওর সেই করুণ মুখ দেখে কী করতাম?
সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা ছিল, অর্ণবের কোনো বন্ধু ছিল না। ক্লাসের যে ছেলেমেয়েরা একসাথে খেলত, আড্ডা দিত, বার্থডে পার্টিতে যেত, অর্ণব কখনো সেই গ্রুপে ছিল না।
একবার ক্লাসের একটা ছেলের জন্মদিনের পার্টি ছিল। পুরো ক্লাসকে ইনভাইট করা হয়েছিল, শুধু তিন-চারজনকে বাদ দিয়ে। অর্ণব ছিল তাদের মধ্যে একজন। পরের দিন স্কুলে সবাই সেই পার্টির গল্প করছিল, আর অর্ণব চুপচাপ বসে ছিল।
বাড়িতে এসে ও আমাকে জিজ্ঞেস করল, “মা, আমার সাথে কেউ বন্ধুত্ব করতে চায় না কেন? আমি কি খুব খারাপ?”
সেদিন আমি অনেক কান্নাকাটি করেছিলাম। রাতে, যখন অর্ণব ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমি ভাবছিলাম, ভালো করার জন্য যে স্কুলে ভর্তি করলাম, সেই স্কুলই কি আমার ছেলেকে ধ্বংস করে দিচ্ছে?
ক্লাস এইট-এ উঠে অর্ণবের আচরণে আমি আরও বেশি পরিবর্তন লক্ষ্য করতে শুরু করলাম। সে আর হাসত না। সারাদিন ঘরে বন্ধ থাকত। খাওয়া-দাওয়া কমে গেল। ওজন কমতে শুরু করল।
রাতে ঠিকমতো ঘুম হত না। মাঝরাতে উঠে বসে থাকত। কখনো কখনো দুঃস্বপ্ন দেখে চিৎকার করে উঠত।
একদিন আমি ওর নোটবুকে দেখলাম, ও লিখেছে – “আমি কিছুই পারি না। আমি একজন ফেলিওর। সবাই আমাকে হেয় করে। আমার বেঁচে থাকার কোনো মানে নেই।”
সেদিন আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। আমার বাচ্চা, আমার তেরো বছরের ছেলে, ভাবছে তার বেঁচে থাকার কোনো মানে নেই!
আমি স্বামীর সাথে কথা বললাম। আমরা ঠিক করলাম, ডাক্তার দেখাতে হবে। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যের ডাক্তার? আমাদের সমাজে তো এটা একটা ট্যাবু। মানুষ ভাবে, পাগল হলে তবেই “মনের ডাক্তার” দেখাতে হয়।
কিন্তু ছেলের অবস্থা দেখে আমরা সাহস করে একজন psychiatrist এর কাছে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার কথা বলার পর বললেন, অর্ণব ডিপ্রেশনে ভুগছে। তার অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারও আছে।
ক্লাস নাইনে উঠে অবস্থা আরও সংকটজনক হল। বোর্ড পরীক্ষার চাপ, স্কুলে বুলিং, বন্ধুহীনতা, শিক্ষকদের অবহেলা – সব মিলিয়ে অর্ণব প্রায় ভেঙে পড়ল।
স্কুলে যাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। আমরা কোনোমতে ওকে স্কুলে পাঠাতাম, কিন্তু ও ক্লাস করত না। লাইব্রেরিতে বা খালি করিডরে বসে থাকত।
পড়াশোনায় আর কোনো মনোযোগ নেই। পরীক্ষায় ফেল করতে শুরু করল। টিউশনে যেত না। আমরা যত বলতাম, ততই ও নিজেকে আরও গুটিয়ে নিত।
ও বাইরে যেতে ভয় পেত। দোকানে যেতে বললে বলত, “না মা, তুমি যাও। আমি মানুষের সামনে যেতে ভয় পায়।” পাড়ার ছেলেরা খেলতে ডাকলে লুকিয়ে থাকত।
সামাজিক উদ্বেগ এত তীব্র হয়ে গেল যে, কারও সাথে কথা বলতে পারত না। চোখে চোখ রাখতে পারত না। হাত কাঁপত। ঘামত।
আমরা বুঝতে পারছিলাম, আমার ছেলে আস্তে আস্তে একটা গভীর অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কী করব, বুঝতে পারছিলাম না।
psychiatrist থেরাপি দিচ্ছিলেন। আমরা নিয়মিত নিয়ে যেতাম। কিন্তু উন্নতি হচ্ছিল খুব ধীরে। ডাক্তার অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট ওষুধও দিয়েছিলেন। কিন্তু সেগুলোরও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল।
ক্লাস টেন হলো, বোর্ড পরীক্ষার বছর। সবার জীবনে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বছর। কিন্তু অর্ণবের জন্য এটা হয়ে উঠল একটা দুঃস্বপ্ন।
স্কুলে চাপ, বাড়িতে চাপ, পাড়ার মানুষের চাপ। সবাই বলত, “এবার তো বোর্ড, ভালো করতে হবে।” কিন্তু কেউ বুঝতে চাইত না, একটা ছেলে যে ডিপ্রেশনে ভুগছে, তার পক্ষে “ভালো করা” কত কঠিন।
এবং তারপর এল সেই দিন। সেই ভয়ংকর দিন যার কথা ভাবলে এখনও আমার শরীর শিউরে ওঠে।
সেদিন ছিল অক্টোবর মাসের ১৫ তারিখ। বিকেল চারটে নাগাদ আমি রান্নাঘরে ছিলাম। অর্ণব তার রুমে ছিল। হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনলাম। দৌড়ে গেলাম।
দরজা বন্ধ। ভেতর থেকে কোনো সাড়া নেই। আমার বুকটা ধক্ করে উঠল। জোরে দরজায় ধাক্কা দিলাম। ভাঙলাম।
আর তারপর যা দেখলাম, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। অর্ণব ফ্যানের সাথে দড়ি বেঁধে…
আমি চিৎকার করে উঠলাম। পাড়ার কয়েকজন লোক দৌড়ে এসে ওকে নামাল। তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ভগবানের দয়ায় ওর প্রাণ বেঁচে গেল।
হাসপাতালে যখন ও জ্ঞান ফিরল, আমি ওর হাত ধরে শুধু কাঁদছিলাম। আর কিছু বলতে পারছিলাম না। আমার ছেলে, আমার পনেরো বছরের ছেলে, মরে যেতে চেয়েছিল। কেন? কারণ স্কুলে তাকে নিয়ে মজা করা হত? কারণ সে “গরিব” ছিল? কারণ সে “মধ্যমেধার ছাত্র” ছিল?
পরে, ওর পকেটে একটা সুসাইড নোট পাওয়া গেল। সেখানে লেখা ছিল:
“মা-বাবা, আমি তোমাদের খুব ভালোবাসি। কিন্তু আমি আর পারছি না। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া আমার কাছে একটা যুদ্ধে যাওয়ার মতো। আমি হেরে যাচ্ছি সেই যুদ্ধে। আমি তোমাদের জন্য শুধু বোঝা। তোমরা আমার জন্য কত কিছু করছ, কিন্তু আমি কিছুই দিতে পারছি না। আমি একজন ফেলিওর। আমি এই পৃথিবীতে থাকার যোগ্য নই। ক্ষমা করো।”
এই চিঠি পড়ে আমার আর স্বামীর মনে হল, আমরাই কি ভুল করেছি? আমরা কি আমাদের ছেলের উপর খুব চাপ দিয়েছি? কিন্তু না, আমরা তো শুধু চেয়েছিলাম ও ভালো থাকুক।
হাসপাতালে এক সপ্তাহ ছিল অর্ণব। সাইকিয়াট্রিক ওয়ার্ডে। সেখানে ডাক্তার, কাউন্সেলর, সবাই আমাদের সাথে অনেক কথা বললেন। আমরা বুঝলাম, এটা শুধু অর্ণবের সমস্যা নয়। এটা একটা পারিবারিক সমস্যা, একটা সামাজিক সমস্যা।
ডাক্তার বললেন, “অর্ণবকে এখন সেই স্কুল থেকে সরিয়ে নিতে হবে। যে পরিবেশ তাকে অসুস্থ করেছে, সেই পরিবেশে রেখে সুস্থ করা যাবে না।”
আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, অর্ণবকে স্কুল থেকে বের করে আনব। হ্যাঁ, বোর্ড পরীক্ষার বছর, কিন্তু ছেলের জীবন তো এর চেয়ে বড়। আমরা তাকে বাড়িতে রেখে পড়াব। পরে ওপেন স্কুল থেকে পরীক্ষা দেবে।
এই সিদ্ধান্ত নিতে কষ্ট হয়েছিল। মানুষ কী বলবে? পাড়ার লোকেরা কী ভাববে? আত্মীয়রা কী মনে করবে? কিন্তু আমরা ঠিক করলাম, মানুষের কথায় কান দেব না। ছেলের জীবন বাঁচানোটাই আসল লক্ষ।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর শুরু হল দীর্ঘ রিকভারির পথ। প্রথম কয়েক মাস ছিল সবচেয়ে কঠিন। অর্ণব কথা বলত না। ঘরে বন্ধ থাকত। খেতে চাইত না।
আমি চাকরি খুঁজতে শুরু করলাম। একটা স্কুলে সাফাই কর্মীর কাজ পেলাম। বেতন কম, কিন্তু কিছু তো হবে। কাউন্সেলিং, থেরাপি, ওষুধ – সব মিলিয়ে অনেক খরচ হচ্ছিল।
আমরা একজন খুব ভালো psychiatrist পেয়েছিলাম, ডঃ মেঘনা সেনগুপ্তা। তিনি প্রথম দিন থেকেই অর্ণবের সাথে অন্যরকম আচরণ করলেন। তিনি বললেন, “অর্ণব, তুমি অসুস্থ নও। তোমার সাথে যা হয়েছে, তা তোমার দোষ নয়। তুমি একজন সারভাইভার।”
এই কথাগুলো অর্ণবকে ভীষণ প্রভাবিত করেছিল। প্রথমবারের মতো কেউ তাকে বলল, সে অসুস্থ নয়। সে দুর্বল নয়। সে একজন যোদ্ধা।
ডঃ মেঘনা প্রতি সপ্তাহে দুবার থেরাপি সেশন নিতেন। কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT), মাইন্ডফুলনেস, ব্রিদিং এক্সারসাইজ – নানা কৌশল শেখাতেন। আস্তে আস্তে অর্ণব নিজের ভেতরের শক্তি খুঁজে পেতে শুরু করল।
তিনি অর্ণবকে জার্নালিং শুরু করতে বললেন। প্রতিদিন নিজের অনুভূতি লিখতে। ভালো লাগা, খারাপ লাগা, ভয়, আশা – সব কিছু। এবং এটা অর্ণবকে অনেক সাহায্য করল।
একদিন অর্ণব তার জার্নালে লিখল:
“আজ আমি বুঝলাম, আমি ফেলিওর নই। স্কুলের সেই ছেলেরা যা বলত, সেগুলো সত্যি নয়। আমার দাম আছে। আমার মূল্য আছে। আমি বেঁচে থাকার যোগ্য।”
এই লেখা পড়ে আমার চোখে জল এসেছিল। খুশির জল।
ডঃ মেঘনা অর্ণবকে একটা গ্রুপ থেরাপিতে যোগ দিতে বললেন। সেখানে অর্ণবের মতো আরও অনেক কিশোর-কিশোরী ছিল যারা ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি, বুলিং-এর শিকার।
প্রথমে অর্ণব যেতে চায়নি। বলল, “মা, আমি মানুষের সামনে কথা বলতে পারব না।”
কিন্তু আমি এবং ডঃ মেঘনা তাকে বুঝিয়ে পাঠালাম। প্রথম সেশনে সে চুপচাপ বসে ছিল। কিছু বলেনি।
কিন্তু যখন সে অন্যদের গল্প শুনল – তারাও একই ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছে – তখন সে বুঝল, সে একা নয়। এই বিশাল পৃথিবীতে আরও অনেকে আছে যারা তার মতো কষ্ট পেয়েছে।
দ্বিতীয় সেশনে অর্ণব নিজের গল্প শেয়ার করল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, স্কুলে কী হয়েছিল, কীভাবে তাকে বুলি করা হত, কেমন লাগত। সবাই চুপচাপ শুনল। কেউ হাসল না। কেউ বিচার করল না। বরং সবাই তাকে সাপোর্ট করলো।
সেদিন ফিরে এসে অর্ণব বলল, “মা, আমি আর একা নই।”
পরের ছয় মাস ছিল খুব কঠিন, কিন্তু আশার। অর্ণব ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছিল। থেরাপি, ওষুধ, পরিবারের ভালোবাসা, এবং সবচেয়ে বড় কথা – ডঃ মেঘনার অক্লান্ত প্রচেষ্টা – সব মিলিয়ে অর্ণব ফিরে আসছিল জীবনের মূল স্রোতে।
সে আবার হাসতে শুরু করল। খেতে শুরু করল। বাইরে বেরোতে শুরু করল।
আমরা তাকে বাড়িতে পড়াতাম। একজন ভালো টিউটর পেয়েছিলাম যিনি অর্ণবের অবস্থা বুঝতেন। তিনি ধৈর্য নিয়ে পড়াতেন, চাপ দিতেন না।
অর্ণব ওপেন স্কুল থেকে দশম শ্রেণির পরীক্ষা দিল। ফলাফল তেমন ভালো হয়নি। সেকেন্ড ডিভিশন। কিন্তু আমাদের কাছে সেটা ছিল সবচেয়ে বড় জয়। আমার ছেলে বেঁচে ছিল। পরীক্ষা দিয়েছিল। পাশ করেছিল। এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী চাই?
দশম পাশ করার পর অর্ণব বলল, “মা, আমি সাইকোলজি পড়তে চাই।”
আমরা অবাক হলাম। সাইকোলজি? কেন?
অর্ণব বলল, “মা, আমি ডঃ মেঘনার মতো হতে চাই। আমার মতো যারা কষ্ট পাচ্ছে, তাদের সাহায্য করতে চাই। আমি বুঝি তারা কেমন অনুভব করছে।”
সেদিন আমার গর্বে বুক ফুলে গেল। আমার ছেলে, যে মরতে চেয়েছিল, সেই ছেলে এখন অন্যদের বাঁচাতে চায়।
অর্ণব এগারো-বারো ক্লাস করল আর্টস নিয়ে। ভালো করল। তারপর সাইকোলজিতে গ্র্যাজুয়েশন। অনেক পড়াশোনা, অনেক পরিশ্রম। কিন্তু এবার সে আর পিছিয়ে পড়া ছাত্র ছিল না। সে ছিল একজন উদ্দেশ্যপূর্ণ ছাত্র।
গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে সে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করল ক্লিনিকাল সাইকোলজিতে। এবং তারপর শুরু করল একজন কাউন্সেলর হিসেবে কাজ।
আজ অর্ণবের বয়স ছাব্বিশ। সে একটা স্কুলে সাইকোলজির শিক্ষক। একই সাথে সে একজন মোটিভেশনাল স্পিকার।
সে স্কুলে স্কুলে যায়, কলেজে যায়, ওয়ার্কশপ করে। কিশোর-কিশোরীদের সাথে কথা বলে। তাদের বলে, মেন্টাল হেলথ নিয়ে। বুলিং নিয়ে। ডিপ্রেশন নিয়ে। সুইসাইড প্রিভেনশন নিয়ে।
সে নিজের গল্প শেয়ার করে। লুকায় না। বলে, “হ্যাঁ, আমি একসময় আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আজ আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি। কারণ আমি বেছে নিয়েছিলাম বাঁচতে। এবং তোমরাও পারবে।”
তার কথা শুনে অনেক ছেলেমেয়ে সাহস পায়। অনেকে এগিয়ে আসে হেল্প নিতে। অর্ণব এখন অনেক স্কুলে গিয়ে শিক্ষকদেরও ট্রেনিং দেয়, কীভাবে সব ছাত্রকে সমান গুরুত্ব দিতে হয়, কীভাবে বুলিং আটকাতে হয়।
সে একটা ইউটিউব চ্যানেলও চালায় – “আলোর পথে অর্ণব”। সেখানে মেন্টাল হেলথ নিয়ে ভিডিও দেয়। হাজার হাজার মানুষ দেখে। অনেকে মেসেজ দেয়, “আপনার ভিডিও দেখে আমি সাহস পেয়েছি।”
আজ যখন আমি আমার ছেলেকে দেখি, একটা স্টেজে দাঁড়িয়ে শত শত মানুষের সামনে কথা বলতে, তখন আমার চোখে জল আসে। সেই ছেলে, যে একসময় কারো চোখে চোখ রাখতে পারত না, সে আজ শত শত মানুষকে অনুপ্রাণিত করছে।
আমি ভাবি, আমরা কী বিশাল ভুল করতে যাচ্ছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল মানেই সাফল্য। আমরা বুঝিনি যে, একটা বাচ্চার জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় হল তার মানসিক স্বাস্থ্য, তার আত্মবিশ্বাস, তার ভালোবাসা পাওয়া।
আজ যখন অর্ণব তার ছাত্রছাত্রীদের পড়ায়, সে নিশ্চিত করে যে ক্লাসের প্রতিটি ছাত্র গুরুত্ব পাচ্ছে। ভালো ছাত্র হোক আর মাঝারি হোক, ধনী পরিবারের হোক আর গরিব পরিবারের হোক – সবাই সমান।
গত সপ্তাহে অর্ণব একটা পুরস্কার পেল – “বেস্ট ইয়ং সাইকোলজিস্ট অফ দ্য ইয়ার”। সেই অনুষ্ঠানে আমি আর আমার স্বামী ছিলাম। যখন অর্ণব স্টেজে গেল পুরস্কার নিতে, আমরা দুজনে কাঁদছিলাম।
অর্ণব তার স্পিচে বলল, “এই পুরস্কার আমার একার নয়। এটা আমার মায়ের, যিনি কখনো আমার উপর আশা ছাড়েননি। এটা আমার বাবার, যিনি আমার চিকিৎসার জন্য দিনরাত খেটেছেন। এটা ডঃ মেঘনা সেনগুপ্তার, যিনি আমাকে বাঁচিয়েছেন। এবং এটা সেই সব ছেলেমেয়ের, যারা এখনও অন্ধকারে আছে। আমি তাদের বলতে চাই – হাল ছেড়ো না। আলো আছে। শুধু একটু ধৈর্য ধরো।”
আজ আমি যখন এই গল্পটা লিখছি, আমার কাছে বসে অর্ণব তার ল্যাপটপে কাজ করছে। একটা নতুন ওয়ার্কশপের প্ল্যান করছে। সে হাসছে। ফোনে কারো সাথে কথা বলছে।
আমি ভাবি, যদি সেদিন…যদি সেদিন আমি আর একটু দেরি করে ঘরে ঢুকতাম…যদি…
কিন্তু না, আমি এসব চিন্তা করি না এখন। কারণ সেটা হয়নি। অর্ণব বেঁচে আছে। শুধু বেঁচে নেই, সে বেঁচে আছে একটা উদ্দেশ্য নিয়ে।
আমি সব মা-বাবাদের বলতে চাই – আপনার সন্তান কোন স্কুলে পড়ে, কত নম্বর পায়, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল, সে কি খুশি? তার কি বন্ধু আছে? তার মানসিক স্বাস্থ্য কেমন? সে কি নিরাপদ বোধ করে?
একটা ফার্স্ট ডিভিশন আর একটা মেডেল, একটা বাচ্চার জীবনের চেয়ে বড় নয়।
আমি সব শিক্ষকদের বলতে চাই – ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে যে ছেলেটা বা মেয়েটা বসে আছে, তার দিকেও একবার তাকান। হয়তো সে খুব ভালো ছাত্র নয়, কিন্তু সে একটা মানুষ। তারও স্বপ্ন আছে, তারও আবেগ আছে, তারও গুরুত্ব পাওয়ার অধিকার আছে।
আমি সব ছেলেমেয়েদের বলতে চাই – তোমরা যদি কষ্টে থাকো, যদি মনে হয় আর পারছ না, তাহলে দয়া করে কারো সাথে কথা বলো। মা-বাবা, শিক্ষক, বড় ভাই-বোন, কাউন্সেলর – কারো না কারো সাথে। একা একা সব বয়ে বেড়িয়ো না। জীবন মূল্যবান। তোমার জীবন মূল্যবান।
আমি জানি সব জানি। কারণ আমি সেই মা, যে প্রায় তার ছেলেকে হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু আজ সেই ছেলে শত শত মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছে।
অন্ধকার কখনো শেষ কথা নয়। অন্ধকারের পরেই আসে আলো। শুধু দরকার – আশা না হারানো, একসাথে দাঁড়ানো, এবং ভালোবাসা।
আজ আমি একজন গর্বিত মা। আমার ছেলে কোনো বড় কোম্পানির সিইও নয়, কোনো বিখ্যাত ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার নয়। কিন্তু সে একজন মানুষ যে অন্যদের বাঁচাচ্ছে। এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী হতে পারে?
অর্ণব প্রায়ই বলে, “মা, আমার সেই অন্ধকার দিনগুলো ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়। কিন্তু একই সাথে, সেগুলো আমাকে এই পথে নিয়ে এসেছে। আজ আমি যা করছি, সেটা করতে পারছি কারণ আমি জানি কষ্ট কী। আমি জানি হতাশা কী। এবং তাই আমি জানি কীভাবে সাহায্য করতে হয়।”
হয়তো এটাই জীবন। কখনো আমরা পড়ে যাই, কিন্তু সেই পড়ে যাওয়াটাই আমাদের শেখায় কীভাবে উঠতে হয়। এবং যখন আমরা ওঠি, আমরা শুধু নিজেরা উঠি না – আমরা অন্যদের হাত ধরে টেনে তুলি।”
আজ রাতে, যখন আমি ঘুমাতে যাব, আমি শান্তিতে ঘুমাব। কারণ আমি জানি, আমার ছেলে ভালো আছে। শুধু ভালো নেই, সে অন্যদের ভালো রাখছে।
এবং যদি এই গল্পটা পড়ে একটা মানুষও সাহস পায়, একটা পরিবার তাদের সন্তানকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারে, একটা শিক্ষক তার সব ছাত্রকে সমান ভালোবাসতে শেখে, তাহলে আমার এই লেখা সার্থক।
মনে রাখবেন – কোনো রাত এতটা অন্ধকার নয় যে সকাল হবে না। শুধু একটু ধৈর্য ধরুন। আলো আসবে। অবশ্যই আসবে।

