ক্ষুধার্ত অপরাধী  (Khudharto Aparadhi)

Khudharto Aparadhi written by Debanshu Ghosh

রাস্তার ধূলিময় প্রান্তে বসে অনন্ত মিত্র তার শেষ বিড়ি টান ছিল । বছর তিরিশের এই যুবকের জীবন ছিল সংগ্রামের এক লম্বা অধ্যায়। কলকাতার দক্ষিণ প্রান্তে একটি ছোট বস্তিতে বেড়ে ওঠা অনন্ত, তার পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সদস্য। বাবা মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে একটি কারখানার দুর্ঘটনায়। মা রোগগ্রস্ত, ছোট বোন স্কুলে পড়ে। দিনে অসংখ্য কাজ করেও অনন্তের পক্ষে সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠেছিল।

“আরেকটা দিন গেল, আরেকটা বিফল দিন,” অনন্ত নিজের মনে বিড়বিড় করলো।

সেদিন সকালে লোকাল গ্যারেজে কাজ করতে গিয়ে অনন্তের বস তাকে বেতন দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। শহরে নতুন বড় গ্যারেজ খোলায় ছোট দোকানগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। সারাদিন কাজের খোঁজে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত অনন্ত এখন বাড়ি ফিরতে ভয় পাচ্ছিল। মায়ের ওষুধ কেনার টাকা নেই, বোনের স্কুলের বেতন বাকি।

হঠাৎ করে দূর থেকে ভেসে আসা একটা শব্দ তার মনোযোগ কেড়ে নিল। শব্দটা আসছিল হাওড়া ব্রিজের নিচের এক নির্জন রাস্তা থেকে। উৎসুক অনন্ত সেদিকে এগিয়ে গেল।

ব্রিজের নিচে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখে অনন্ত থমকে দাঁড়াল। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো কয়েকটি উচ্চ প্রযুক্তির গাড়ি, চারপাশে উত্তেজিত ভিড়, আর তার মাঝে একজন সুট পরা লোক মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে টাকার বাণ্ডিল হাতে নিয়ে হাঁটছে।

“ড্র্যাগ রেস,” একটি কিশোর অনন্তের পাশে দাঁড়িয়ে বলল। “এখানে প্রতি সপ্তাহে হয়। বাজি ধরে ধরে লোকে লাখ লাখ টাকা জিতছে আর হারছে।”

অনন্তের চোখে জ্বলে উঠল এক আলো। সেখানে দাঁড়িয়ে সে দেখল রাত বাড়ার সাথে সাথে বাজির অঙ্ক বাড়ছে, মদের বোতল খুলছে, নোটের বাণ্ডিল হাত বদল হচ্ছে। এক রাতে যা টাকা ঘুরছে, তা দিয়ে মায়ের চিকিৎসা, বোনের পড়াশোনা, সবই চলতে পারে মাসের পর মাস।

সেই রাতে অনন্ত মিত্রের জীবনে এক নতুন অধ্যায় শুরু হল।

দু’সপ্তাহ ধরে অনন্ত ড্র্যাগ রেসের আড্ডায় যাতায়াত করছিল। সুট পরা লোকটি ছিল অমিত ঘোষ, এলাকার নামকরা গুণ্ডা। অনন্ত ধীরে ধীরে অমিতের বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠল। প্রথমে গাড়ির টায়ার পরিষ্কার করা, পার্কিং দেখাশোনা করা, এমন ছোটখাটো কাজ দিয়ে শুরু। কিন্তু অনন্তের চোখ ছিল বাজি ধরার ব্যবস্থার উপর।

“দাদা, এই বাজি ধরার ব্যাপারটা আরও বড় করা যায় না?” একদিন সাহস করে অমিতকে জিজ্ঞাসা করল অনন্ত।

“কীভাবে?” অমিত সিগারেট ধরাতে ধরাতে জিজ্ঞেস করল।

“মোবাইল অ্যাপ দিয়ে। গাড়ি রেস দেখতে না এসেও লোকে বাজি ধরতে পারবে। পুরো শহরের লোক…এমনকি দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে…” অনন্ত উত্সাহে বলে চলল।

অমিতের চোখে চমক লাগল। সে অনন্তকে নিয়ে তার গাড়িতে তুলল।

“তুই বিজনেস বুঝিস দেখছি। আয় তোকে আরেকজনের সাথে দেখা করাই।”

এভাবেই অনন্ত পরিচিত হল বিকাশ দত্তের সাথে, যিনি ছিলেন অবৈধ জুয়া, মাদক ব্যবসা এবং হিট ম্যান সার্ভিস সহ নানা ধরনের অপরাধের এক প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের মালিক। বিকাশ অনন্তের ধারণায় মুগ্ধ হলেন।

তিন মাসের মধ্যে “স্পিড বেট” নামে একটি অ্যাপ তৈরি হয়ে গেল। বাইরে থেকে দেখতে এটি ছিল একটি রেসিং গেম, কিন্তু ভেতরে ছিল বাস্তব ড্র্যাগ রেস এবং অন্যান্য অবৈধ প্রতিযোগিতার উপর বাজি ধরার পুরো ব্যবস্থা। অনন্তকে দেওয়া হল ১০% কমিশন এবং অন্যান্য বেআইনি কার্যকলাপে অংশগ্রহণের সুযোগ।

অনন্তের জীবন বদলে গেল। ছোট্ট বস্তির ঘর ছেড়ে সে উঠে গেল শহরের এক আধুনিক এলাকায়। মা পেলেন উন্নত চিকিৎসা, বোন ভর্তি হল নামকরা স্কুলে। কিন্তু এর পেছনে যে মূল্য দিতে হবে, সেটা অনন্ত তখনও বুঝতে পারেনি।

বছর ঘুরতে না ঘুরতেই “স্পিড বেট” অ্যাপের ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছাড়িয়ে গেল লক্ষ। টাকার স্রোত বইতে শুরু করলো অনন্তের দিকে। কিন্তু টাকার সাথে সাথে এল নতুন নতুন দায়িত্ব। বিকাশ দত্ত এখন অনন্তকে আরও বড় কাজে ব্যবহার করতে চাইছিলেন।

“অনন্ত, তুই হোশিয়ার ছেলে। তোকে আমরা বিশ্বাস করি। আমাদের নতুন বিজনেসে তোকে দেখভাল করতে হবে,” বিকাশ দত্ত একদিন তাকে ডেকে বললেন।

নতুন “বিজনেস” ছিল মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। হেরোইন, কোকেন, এমডিএমএ – সবই বিদেশ থেকে আসছিল এবং কলকাতার মাধ্যমে পুরো পূর্ব ভারতে ছড়িয়ে পড়ছিল। অনন্ত এখন ছিল এই নেটওয়ার্কের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

“আমি কি সঠিক পথে আছি?” অনন্ত মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করত। কিন্তু তারপরই তার মনে পড়ত মায়ের হাসিমুখ, বোনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, আর পিছু হটার কোনো উপায় ছিল না।

এরপর এল প্রথম হত্যাকাণ্ড। একটি প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপ তাদের মাদক পাচারের রুট জানতে পেরে হুমকি দিতে শুরু করেছিল। বিকাশ দত্ত সবাইকে একটি মিটিংয়ে ডাকলেন।

“এদের ঠান্ডা করতে হবে,” বিকাশ বললেন। “অনন্ত, তুই যাবি অমিতের সাথে।”

সেই রাতে অনন্ত প্রথমবারের মতো দেখল মৃত্যুর মুখ। প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের তিনজন সদস্যকে একটি নির্জন গুদামে নিয়ে গিয়ে গুলি করা হল। অনন্ত নিজে ট্রিগার টানেনি, কিন্তু সে সেখানে উপস্থিত ছিল, সাক্ষী হিসেবে। রক্তের লাল রঙ তার স্বপ্নে আসতে শুরু করল।

“এটাই বিজনেস, অনন্ত,” অমিত তার কাঁধে হাত রেখে বলেছিল। “আমাদের জগতের নিয়ম এটাই।”

সময়ের সাথে সাথে অনন্ত বদলে গেল। সেই গরিব, নম্র যুবকের জায়গায় এখন দাঁড়িয়ে আছে এক নিষ্ঠুর, শীতল চোখের মানুষ। তার চারপাশে ঘটতে থাকা অপরাধ, হিংসা আর মৃত্যু তাকে সংবেদনশূন্য করে তুলল। মায়ের কাছে সে বলত ব্যবসা ভালো চলছে, কিন্তু কী ব্যবসা তা কখনোই বলেনি।

অনন্তের নেতৃত্বে “স্পিড বেট” অ্যাপের সাথে যুক্ত হল আরও অনেক অবৈধ ব্যবসা। অনলাইন জুয়া, অশ্লীল ভিডিও স্ট্রিমিং, এমনকি অবৈধ অস্ত্র বিক্রির গোপন চ্যানেলও চালু হয়ে গেল। টাকা আসছিল স্রোতের মতো। অনন্ত কিনল শহরের বুকে একটি বিলাসবহুল বাড়ি, নামী দামী গাড়ি, দামি পোশাক। তার ভাবমূর্তি হয়ে দাঁড়াল এক সফল ব্যবসায়ীর।

কিন্তু এই আবরণের নিচে লুকিয়ে থাকা পাপের বোঝা দিন দিন ভারী হতে লাগল। একদিন রাতে মদ্যপ অবস্থায় অনন্ত একটি ক্লাবে ঝগড়া শুরু করল। পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠলে অনন্ত তার অস্ত্র বের করে ফেলল। আতঙ্কিত ভিড়ের মধ্যে একজন পিতা নিজের ছোট মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে অনন্তের গুলিতে মারা গেলেন।

“আমি চাইনি…” অনন্ত তার বডিগার্ডদের দিকে তাকিয়ে থতমত খেয়ে গেল।

“চলে আসো, বস। আমরা সামলে নেব,” বডিগার্ড হরেন তাকে টেনে গাড়িতে তুলল।

পরের দিন খবরের কাগজে বড় করে ছাপা হল: 

ক্লাবে গুলিতে পিতা নিহত, শিশু কন্যা আহত। 

অনন্ত বুঝতে পারল সে একটি নিরপরাধ বাবাকে হত্যা করেছে, একটি বাচ্চা মেয়েকে আহত করেছে। কিন্তু বিকাশ দত্তের প্রভাব এতটাই ছিল যে পুলিশ অন্য একজনকে গ্রেফতার করল। টাকার বিনিময়ে সাক্ষীরা মুখ বন্ধ রাখল।

অনন্তের হত্যার তালিকা বাড়তে লাগল। একজন প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবসায়ী যিনি “স্পিড বেট” এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন, একজন সাংবাদিক যিনি তাদের কার্যকলাপ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছিলেন, এবং একজন পুলিশ অফিসার যিনি ঘুষ নিতে অস্বীকার করেছিলেন – সবাই একে একে নিহত হলেন।

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে অনন্ত মায়ের দেওয়া কালী মায়ের ছবির দিকে তাকাত। “আমি কী করছি?” সে নিজেকে প্রশ্ন করত। কিন্তু এখন আর ফেরার পথ ছিল না।

বিকাশ দত্তের গ্রুপের ক্ষমতা বাড়তে থাকার সাথে সাথে তারা সরকারি সংস্থাগুলিতেও প্রভাব বিস্তার করতে লাগল। কিন্তু মাদক ব্যবসার বিস্তৃতি এবং বারবার ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড সিবিআই-এর নজরে এল।

সিবিআই অফিসার অনিমেষ ঘোষ এই কেসের দায়িত্ব নিলেন। তিনি অত্যন্ত ঈমানদার ও দক্ষ অফিসার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অনিমেষ গোপনে তদন্ত শুরু করলেন। 

একদিন অনন্তের ফোন বাজল। ” বিপদ,” অমিত অস্থির গলায় বলল। “আমাদের গাড়ি চালক মানিক সিবিআই-এর সাথে কথা বলছে।”

সেই রাতেই মানিককে ব্রিজের নিচে নির্জন জায়গায় ডেকে নিয়ে যাওয়া হল। অমিত অনন্তের দিকে তাকিয়ে বলল, “বস, তোমারই হাতে হওয়া উচিত। লয়ালটি প্রমাণ করার সময় এসেছে।”

দীর্ঘ সময় পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে থাকার পর অনন্ত ট্রিগার টানল। এই প্রথম তার হাতে সরাসরি কাউকে হত্যা করল সে।

কিন্তু পরের দিন সকালে ফোনে যে খবর এল, তাতে অনন্তের হৃদয় থেমে গেল। তার ছোট বোন রূপাকে স্কুল থেকে ফেরার পথে অপহরণ করা হয়েছে।

“বিকাশদা, আমার বোন…” অনন্ত কাঁপা গলায় ফোনে বলল।

“জানি। আমাদের প্রতিপক্ষ বোধহয় আমাদের দুর্বল জায়গাটা ধরে ফেলেছে,” বিকাশ ঠাণ্ডা গলায় বললেন। “চিন্তা করো না, আমরা খুঁজে বের করব।”

তিন দিন পার হয়ে গেল। অনন্ত পাগলের মতো শহর তোলপাড় করল, কিন্তু রূপার কোনো খোঁজ মিলল না। চতুর্থ দিনে একটি বাক্সে রূপার রক্তমাখা স্কুলের ইউনিফর্ম পাওয়া গেল। সাথে একটি নোট: “সিবিআই অফিসার অনিমেষ ঘোষকে পিছু হটাও, নইলে এরপর তোমার মা।”

অনন্ত ভেঙে পড়ল। তার ছোট বোন, যার জন্য সে এতকিছু করতে চেয়েছিল, আজ তার কারণেই মৃত। তার মা, যাকে রক্ষা করতে সে এই পাপের পথে পা বাড়িয়েছিল, এখন বিপদে।

সেই রাতে অনন্ত একটি সিদ্ধান্ত নিল, যা তার জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত হবে।

“বিকাশদা, সিবিআই-এর ঘোষকে আমিই সামলাব,” পরদিন সকালে অনন্ত ঘোষণা করল। “আমার বোনের রক্ত বৃথা যাবে না।”

অনন্ত প্রতিশোধ নিতে উন্মাদের মত হয়ে উঠল। সে সন্দেহ করছিল, সিবিআই নয়, তার প্রতিদ্বন্দ্বী একটি গ্রুপই রূপাকে হত্যা করেছে। কিন্তু এই সুযোগে সে অনিমেষ ঘোষকে হত্যা করে সিবিআই-কে একটি বার্তা দিতে চাইল।

একটি গোপন সূত্র থেকে অনন্ত জানল অনিমেষ ঘোষ প্রতি শনিবার সকালে একটি পার্কে জগিং করেন। পরের শনিবার অনন্ত নিজে স্নাইপার রাইফেল নিয়ে একটি বিল্ডিংয়ের ছাদে অবস্থান নিল।

কিন্তু যখন অনিমেষ ঘোষ পার্কে এলেন, তার সাথে ছিল তার ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে, জগিং করতে এসেছে বাবার সাথে। অনন্ত স্কোপের মধ্য দিয়ে দেখল। মেয়েটির বয়স হবে, সাত-আট বছর। হাসিখুশি, বাবার হাত ধরে দৌড়াচ্ছে।

অনন্তের হাত কেঁপে উঠল। কয়েক মিনিট স্কোপের মধ্য দিয়ে তাকিয়ে থাকার পর সে রাইফেল নামিয়ে রাখল। তার মনে পড়ল নিজের বোনের কথা, তার হাসি, তার স্বপ্ন। এই শিশুটিকে, আরেকটি পরিবারকে সে সেই একই বেদনা দিতে পারল না।

কিন্তু এই দ্বিধা তার জীবনের সর্বনাশ ডেকে আনল।

অনন্তের অসম্পূর্ণ মিশন বিকাশের কানে গেল। বিকাশ তাকে ডেকে পাঠালো।

“তুমি দুর্বল হয়ে যাচ্ছ, অনন্ত,” বিকাশ শীতল গলায় বললেন। “আমাদের বিজনেসে দুর্বলদের স্থান নেই।”

অনন্ত বুঝতে পারল এখন তার জীবন বিপন্ন। সে তার মাকে নিয়ে পালাবার পরিকল্পনা করল। কিন্তু তার আগেই সিবিআই তার সব তথ্য পেয়ে গেল।

মানিক অসম্পূর্ণ মৃত অবস্থায় সিবিআই-এর কাছে গিয়েছিল। অনিমেষ ঘোষ গোপনে তদন্ত চালিয়ে সমস্ত প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন। অনন্তের ফোন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, “স্পিড বেট” অ্যাপের সার্ভার – সবকিছুই এখন সিবিআই-এর হাতে।

অনিমেষ জানতেন অনন্ত তাকে হত্যা করতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে এসেছিল। এটা দেখিয়ে দেয় তার মধ্যে এখনও মানবতা টিকে আছে।

“অনন্ত মিত্রকে জীবিত ধরতে হবে,” অনিমেষ তার টিমকে নির্দেশ দিলেন। “ওর থেকে আমরা পুরো নেটওয়ার্কের তথ্য পেতে পারি।”

কিন্তু বিকাশ দত্ত অনেক শক্তিশালী লোক। সিবিআই অপারেশন শুরু করার আগেই তিনি জেনে গেলেন। অনন্তের মোবাইলে একটি সন্দেহজনক কল আসল। গলার স্বর শুনে অনন্ত বুঝতে পারল তাকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।

“মা, আমরা বিপদে,” অনন্ত তার মাকে ফোন করে বলল। “আমি অনেক বড় ভুল করেছি…আমি আসছি আপনাকে নিয়ে যেতে।”

কিন্তু অনন্ত যখন মায়ের কাছে পৌঁছল, তখন বিকাশের লোকেরা তার মাকে বেঁধে ঘিরে রেখেছে।

“আমরা তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম, অনন্ত,” অমিত সিগারেট জ্বালিয়ে বলল। “এটা বিকাশদার আদেশ। আমরা তোমাকে নিয়ে যাব।”

অনন্ত জানত বিকাশের কাছে নেওয়া মানে মৃত্যু। মায়ের চোখে আতঙ্ক দেখে সে মোরিয়া হয়ে উঠলো। পকেট থেকে পিস্তল বের করে অমিতসহ তিনজন গুন্ডাকে গুলি করল। মা চিৎকার করে উঠলেন।

“মা, চলে আসো! আমাদের পালাতে হবে!” অনন্ত মাকে টেনে নিয়ে গাড়িতে উঠল।

গাড়ি ছুটে চলল শহরের বাইরের দিকে। কিন্তু বিকাশের লোকেরা তাদের পিছু নিয়েছিল। একটি ফ্লাইওভারের উপর গুলি চলতে শুরু করল। অনন্তের গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। প্রচণ্ড শব্দে গাড়ি ধাক্কা খেল রেলিং-এ, ভারসাম্য হারিয়ে ঝুলে পড়ল ফ্লাইওভার থেকে।

“মা!” অনন্ত চিৎকার করে উঠল। তার আগেই তারা পড়ে গেল নিচে। গাড়ি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

অনন্ত জ্ঞান হারানোর আগে দেখল তার মা রক্তাক্ত অবস্থায় নিশ্চল হয়ে পরে আছে। তার চোখে জল এল। “আমি সবকিছু নষ্ট করে দিয়েছি…সব…”

যখন অনন্তের জ্ঞান ফিরল, সে নিজেকে একটি হাসপাতালে দেখতে পেল। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন সিবিআই অফিসার অনিমেষ ঘোষ।

“তোমার মা মারা গেছেন,” ঘোষ শান্ত গলায় বললেন। “তুমি গুরুতর আহত, কিন্তু বেঁচে আছ। অনন্ত মিত্র, তোমাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে নরহত্যা, মাদক পাচার, অবৈধ জুয়া পরিচালনা এবং আরও অনেক অপরাধের অভিযোগে।”

অনন্ত চোখ বন্ধ করে ফেলল। “আমি সবকিছু স্বীকার করব। আমি প্রমাণ দেব বিকাশ দত্তের বিরুদ্ধে। কিন্তু একটা অনুরোধ…আমার বোন রূপা…তার হত্যাকারীদের খুঁজে বের করুন।”

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ অনন্ত সিবিআই-কে সমস্ত তথ্য দিল। “স্পিড বেট” অ্যাপের সার্ভার থেকে ডাটা, মাদক পাচারের রুট, হত্যাকাণ্ডের বিবরণ, রাজনৈতিক যোগসাজশের প্রমাণ – সবকিছু। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সিবিআই বিকাশ দত্তকে গ্রেফতার করল, এবং তার পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ল।

কিন্তু অনন্ত জানত বিকাশের প্রভাব এতটাই গভীর যে জেল থেকেও সে অনন্তকে হত্যা করতে পারবে। রূপার হত্যাকারীরা এখনও ধরা পড়েনি। অনন্ত নিজের পরিণতি বুঝতে পারছিল।

একদিন রাতে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা অবস্থায় অনন্ত জানলার বাইরে একটি ছায়ামূর্তি দেখতে পেল। পিস্তলধারী এক লোক। সে বুঝতে পারল এটাই শেষ মুহূর্ত।

“এটাই আমার প্রাপ্য,” অনন্ত মনে মনে ভাবল।

কিন্তু গুলি চালানোর আগেই একজন পুলিশ অফিসার সেই ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন। আলার্ম বেজে উঠল। হত্যাকারী পালানোর চেষ্টা করল, কিন্তু পুলিশের সাথে গুলি বিনিময় হতে লাগল। অনন্ত দেখল, পুলিশের গুলিতে হত্যাকারী আহত হয়েছে, কিন্তু তবুও সে আবার গুলি করার চেষ্টা করছে।

সিবিআই অফিসার ঘোষ ঘটনাস্থলে ছিলেন। অনন্ত দেখল তিনি বিপদে। মুহূর্তের মধ্যে অনন্ত সিদ্ধান্ত নিল। সে তার ক্ষীণ শক্তি নিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল, এবং যখন হত্যাকারী ঘোষের দিকে গুলি করতে যাচ্ছিল, তখন অনন্ত নিজেকে তার সামনে ফেলে দিল।

গুলি এসে বিদ্ধ হল অনন্তের বুকে। সেই হত্যাকারীকে অবশেষে পুলিশ গুলি করে হত্যা করল।

অনন্ত মাটিতে পড়ে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখল অনিমেষ ঘোষ তার পাশে বসে আছেন।

“কেন?” ঘোষ জিজ্ঞাসা করলেন।

“আমার বোনের জন্য যে আমি এই পথে এসেছিলাম, শেষে আমিই তার মৃত্যুর কারণ হলাম,” অনন্ত ক্ষীণ গলায় বলল। “আপনার মেয়ে…যাকে আমি হত্যা করতে পারিনি…সে যেন কখনো তার বাবাকে হাঘোষ না। আমার মতো পাপীর জীবন দিয়ে যদি আপনার জীবন বাঁচে…”

ঘোষের হাত ধরে অনন্ত শেষ কথাটি বলল, “আমি জানি স্বর্গে জায়গা পাব না, কিন্তু রূপা আর মা যদি আমাকে ক্ষমা করে…”

তার চোখ বন্ধ হয়ে গেল। অনিমেষ ঘোষ অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে রইলেন এই যুবকের দিকে, যে ভালো থেকে মন্দের পথে গিয়েছিল, আবার শেষে এক মহৎ কাজ করে চলে গেল।

পরদিন সকালের খবরের কাগজে হেডলাইন হল: “অপরাধী অনন্ত মিত্র পুলিশ এনকাউন্টারে নিহত।” সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, অনন্ত পালানোর চেষ্টা করেছিল, এবং গুলি বিনিময়ের সময় মারা গেছে। কেউ জানত না যে সে অনিমেষ ঘোষের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন দিয়েছিল।

বিকাশ দত্ত এবং তার সহযোগীদের বিচার হল। তাদের দীর্ঘ সাজা হল। “স্পিড বেট” অ্যাপটি বন্ধ করে দেওয়া হল। রূপার হত্যাকারীদেরও চিহ্নিত করা হল – তারা প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের সদস্য ছিল।

অনিমেষ ঘোষ অনন্তের বাড়ি গেলেন। সেখানে কেউ ছিল না। পাপী, অপরাধী, হত্যাকারী – সবাই তাকে ভুলে গিয়েছিল। তিনি অনন্তের ছবির সামনে একটি ফুল রাখলেন।

“তুমি ভুল পথে গিয়েছিলে, অনন্ত,” তিনি ধীরে ধীরে বললেন। “কিন্তু শেষ মুহূর্তে তুমি প্রমাণ করেছ যে তোমার ভেতরে সেই ভালো মানুষটা এখনও বেঁচে ছিল। আমার মেয়ে আজও তার বাবাকে পেয়েছে তোমার কারণে। আমি তোমাকে ধন্যবাদ জানাই এবং আশা করি, তুমি শান্তিতে থাকবে।”

একটি হালকা বাতাস বইল। ঘোষ মনে করলেন যেন কেউ তার কথা শুনতে পেয়েছে।

কলকাতা শহরে আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরে এল। “স্পিড বেট” অ্যাপের জায়গায় এখন নতুন অ্যাপ, নতুন অপরাধ চক্র তৈরি হয়েছে। কিন্তু অনিমেষ ঘোষ এবং তার সহকর্মীরা সজাগ রয়েছেন। তারা জানেন অনন্ত মিত্রের গল্প একটি শিক্ষা – যে কীভাবে গরিবি, হতাশা, এবং পরিবারকে বাঁচানোর চেষ্টা একজন সাধারণ মানুষকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যেতে পারে।

ঘোষ তার মেয়েকে স্কুলে দিতে যাওয়ার সময় মাঝে মাঝে ভাবেন অনন্তের কথা। তিনি জানেন প্রতিটি অপরাধীর পেছনে একটি গল্প থাকে, একটি কারণ থাকে, যা তাকে সেই পথে নিয়ে যায়। পরিবারের প্রতি ভালোবাসা কখনো কখনো আমাদের অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু সেই ভালোবাসাই আবার আলোর দিকে ফিরিয়ে আনে।

অনিমেষ ঘোষের দৃঢ় বিশ্বাস, সমাজে অপরাধ কমাতে হলে শুধু আইনি ব্যবস্থা নয়, পরিবর্তন আনতে হবে সামাজিক ব্যবস্থায়, যেখানে গরিব মানুষদের জীবিকার জন্য অপরাধের পথে যেতে না হয়। তাই তিনি একটি ফাউন্ডেশন শুরু করলেন গরিব যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য।

“অনন্ত মিত্র ফাউন্ডেশন” – এর নাম দিলেন তিনি। ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য ছিল সেই সব যুবকদের সাহায্য করা, যারা অভাবের কারণে অপরাধের পথে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

এদিকে বিকাশ দত্ত জেলে বসে প্রতিশোধের পরিকল্পনা করছিল। সে জানত একদিন সে বেরিয়ে আসবে, এবং তখন সে অনিমেষ ঘোষ এবং তার পরিবারকে খুঁজে বের করবে।

Leave comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *.