Startup

Startup written by Debanshu Ghosh
জিতেশ্বর ঘোষ, ডাকনাম জিতেশ, কলকাতার এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। উল্টোডাঙ্গার ছোট্ট দুই কামরার ফ্ল্যাটে বাবা-মা আর ছোট বোনকে নিয়ে তার সংসার। আইআইটি খড়্গপুর থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে গুড়গাঁওয়ের একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি করছিল সে। মাসে আশি হাজার টাকা বেতন, এসি অফিস, ফ্রি ক্যাফেটেরিয়া – সব মিলিয়ে বাবা-মায়ের স্বপ্নপূরণ হয়েছিল। একটা মধ্যবিত্ত ঘরের বাবা মা যেটা চায়।
কিন্তু জিতেশের মন পড়ে ছিল অন্যদিকে। প্রতিদিন অফিসে বসে কোডিং করতে করতে সে ভাবত, “এই কি আমার জীবন? আমি কি শুধু একটা কলের চাকা হয়ে ঘুরতে থাকব সারাজীবন?” তার মাথায় ঘুরপাক খেত একটা আইডিয়া – ভারতীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য একটা সহজ অ্যাকাউন্টিং ও ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার। নাম দিয়েছিল “দোকানদার”।
ছোটবেলা থেকেই দেখেছে, তার কাকা মুদিখানা চালাতেন। খাতায় হিসেব রাখতেন, মাস শেষে গুণে দেখতেন লাভ-লোকসান। কতবার যে হিসেবে গড়মিল হতো! জিতেশ ভাবত, যদি একটা সহজ বাংলা ইন্টারফেসের অ্যাপ বানানো যায়, যেটা এই ছোট দোকানদারেরাও ব্যবহার করতে পারবে, তাহলে কত মানুষের কাজ সহজ হয়ে যাবে!
২০২২ সালের জুলাই মাসে জিতেশ ঠিক করল, এবার আর দেরি নয়। সে তার সেভিংস থেকে দুই লাখ টাকা বের করে একটা ছোট টিম গঠন করল। সপ্তাহান্তে আর অফিসের পর সন্ধ্যেবেলা কাজ করতে লাগল প্রোটোটাইপ বানাতে।
ছয় মাস পর যখন তার অ্যাপের বেটা ভার্সন রেডি হলো, জিতেশ সাহস করে বাড়ি ফিরে বাবা-মাকে বলল, “আমি চাকরি ছেড়ে নিজের স্টার্টআপ করতে চাই।”
বাবা অমলেশ ঘোষ চোখ কপালে তুললেন। “কী বললি? আশি হাজার টাকার চাকরি ছেড়ে দিবি? তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি?”
মা গীতা দেবী হাত কচলাতে লাগলেন। “বাবা, এখন তো তোর বোনের বিয়ের বয়স হয়ে এসেছে। একটা স্থায়ী চাকরি থাকলে ভালো ছেলে পাওয়া যাবে। এই স্টার্টআপ-ফার্টআপ কী জিনিস? আজকাল ছেলেরা সব পাগল হয়ে গেছে!”
জিতেশ বোঝাতে চেষ্ট করল, তার ভিশন কী, কেন সে এটা করতে চায়। কিন্তু বাবা-মা শুনলেন না। ঝগড়া হলো, কান্নাকাটি হলো। শেষমেশ জিতেশ বলল, “বাবা, আমি একবার চেষ্টা করে দেখতে চাই। ব্যর্থ হলে আবার চাকরি খুঁজব। কিন্তু না করে আফসোস করতে চাই না।”
এক সপ্তাহ পর, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে, জিতেশ অফিসে রেজিগনেশন লেটার জমা দিল। কলিগরা অবাক, কেউ কেউ বলল পাগলামি করছে, আবার কেউ কেউ মনে মনে ঈর্ষা করল তার সাহসের।
চাকরি ছাড়ার পর জিতেশ ফিরে এল কলকাতায়। বাড়ির একটা ছোট্ট ঘরে তার “অফিস” সাজাল – একটা ল্যাপটপ, একটা টেবিল, আর অনেক স্বপ্ন নিয়ে। তার দুই বন্ধু, রাহুল আর অভিজিৎ, তার সাথে জয়েন করল। তারা তিনজন মিলে দিনরাত খেটে অ্যাপটা আরও উন্নত করতে লাগল।
কিন্তু সমস্যা শুরু হলো প্রথম মাস থেকেই। নিজেদের সেভিংসের টাকায় চলছিল সব। তিন মাস পর যখন টাকা ফুরোতে লাগল, তখন বাস্তবতা চোখের সামনে এসে দাঁড়াল।
“জিতেশ, আমার বাবা বলছেন কোনো ইনকাম না থাকলে আমি আর এই স্টার্টআপে সময় দিতে পারব না,” রাহুল একদিন গুরুগম্ভীর মুখে বলল।
জিতেশের মাথায় যেন বজ্রপাত হলো। “কিন্তু রাহুল, আমরা এতদূর এসে গেছি! এখন ছেড়ে দিলে সব শেষ!”
অভিজিৎও দুশ্চিন্তায় ছিল। তার বাবা অসুস্থ, চিকিৎসার খরচ চলছে। সে নিজেও চাপে ছিল।
জিতেশ বুঝল, ফান্ডিং না পেলে তার স্বপ্ন মাটিতে মিশে যাবে। সে শুরু করল এঞ্জেল ইনভেস্টর খোঁজা। লিঙ্কডইনে মেসেজ পাঠাল, স্টার্টআপ ইভেন্টে গেল, পিচ করল যেখানে সুযোগ পেল।
কিন্তু সবাই ফিরিয়ে দিল।
“তোমার মার্কেট সাইজ ছোট।”
“রেভিনিউ মডেল ক্লিয়ার নয়।”
“এই সেক্টরে কম্পিটিশন অনেক।”
“ট্র্যাকশন কম।”
প্রত্যেকটা “না” জিতেশের আত্মবিশ্বাসে আঘাত হানত। কিন্তু সে হার মানেনি।
২০২৩ সালের এপ্রিলে রাহুল শেষমেশ বেরিয়ে গেল। “সরি ভাই, আমি আর পারছি না। আমার পরিবার আর্থিকভাবে অনেক চাপে।” চোখের জলে বিদায় নিল সে।
এখন মাত্র জিতেশ আর অভিজিৎ। দুজনে মিলে দিনে আঠারো ঘণ্টা খাটতে লাগল। জিতেশ তার সেভিংসের শেষ টাকাগুলো ঢেলে দিল। বাড়িতে তার প্রতি কথায় তীর্যক মন্তব্য শুনতে হতো।
“দেখেছ, বলেছিলাম না এসব পাগলামি করতে নেই?”
“বন্ধুদের সবার চাকরি হয়েছে, তুই একা বেকার বসে আছিস!”
“এখন কী করবি? কে বিয়ে দেবে তোকে?”
এসব কথা শুনে জিতেশের মন ভেঙে যেত। কিন্তু মাঝরাতে যখন সে একা বসে কোড লিখত, তখন মনে হতো – “আমাকে করতেই হবে। আমি হার মানতে পারি না।”
একদিন খুব হতাশ হয়ে জিতেশ তার ছোট বোন তমালিকার কাছে গেল। তমালিকা তখন কলেজে পড়ে। সে দাদার হাত ধরে বলল, “দাদা, তুমি যেটা ঠিক মনে কর, সেটাই কর। আমি তোমার উপর বিশ্বাস রাখি। তুমি পারবে।”
সেই কথাগুলো জিতেশকে নতুন শক্তি দিল।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে একটা স্টার্টআপ পিচিং ইভেন্টে জিতেশ প্রেজেন্টেশন দিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সুদীপ মেহতা, একজন সিরিয়াল এন্ট্রাপ্রেনিউর আর এঞ্জেল ইনভেস্টর। জিতেশের প্রেজেন্টেশনে তিনি আগ্রহী হলেন।
ইভেন্টের পর সুদীপ জিতেশকে ডেকে বললেন, “তোমার আইডিয়া ভালো। কিন্তু তুমি ভুল মার্কেট টার্গেট করছ। শুধু ছোট দোকানদার নয়, তোমার ফোকাস হওয়া উচিত MSME সেক্টরে। সেখানে আরও বড় মার্কেট আছে।”
জিতেশ বুঝল, সুদীপবাবু ঠিক বলেছেন। পরের তিন মাস সে তার পুরো প্রোডাক্ট স্ট্র্যাটেজি রিভাইজ করল। নতুন ফিচার যোগ করল, MSMEদের কথা মাথায় রেখে।
অক্টোবরে সুদীপ মেহতা জিতেশকে ফোন করলেন। “জিতেশ, আমি তোমার স্টার্টআপে বিশ লাখ টাকা ইনভেস্ট করতে চাই। কুড়ি পার্সেন্ট ইক্যুইটির বিনিময়ে।”
জিতেশ বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার চোখ ছলছল করে উঠল। “থ্যাংক ইউ, স্যার! আপনি আমার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে দিলেন!”
বিশ লাখ টাকার ফান্ডিং পেয়ে জিতেশ নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করল। সে একটা ছোট অফিস ভাড়া নিল বালিগঞ্জে, চার জন নতুন ডেভেলপার হায়ার করল, একজন মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ নিল।
রাহুলকে ফোন করল। “রাহুল, আমরা ফান্ডিং পেয়েছি। তুই ফিরে আয়।”
রাহুল খুশিতে চিৎকার করে উঠল। “সত্যি? আমি আসছি কাল!”
কিন্তু সংগ্রাম শেষ হয়নি, নতুন চ্যালেঞ্জ শুরু হলো। প্রোডাক্ট মার্কেটে নিয়ে আসা, কাস্টমার অ্যাকুইজিশন, টিম ম্যানেজমেন্ট – সবকিছু নতুন করে শিখতে হলো জিতেশকে।
প্রথম তিন মাসে মাত্র পঞ্চাশটা কাস্টমার সাইন আপ করল। কিন্তু জিতেশ হাল ছাড়েনি। সে নিজে ফিল্ডে নেমে গেল, কাস্টমারদের সাথে কথা বলল, তাদের ফিডব্যাক নিল, প্রোডাক্ট ইমপ্রুভ করল।
ধীরে ধীরে কাস্টমার বাড়তে লাগল। ওয়ার্ড অফ মাউথ শুরু হলো। দোকানদাররা একে অপরকে বলতে লাগল, “এই অ্যাপটা খুব ভালো, বাংলায় আছে, সহজ ব্যবহার করা যায়।”
২০২৪ সালের মার্চ নাগাদ “দোকানদার” অ্যাপের দশ হাজার ইউজার হয়ে গেল। মাসিক রিকারিং রেভিনিউ পৌঁছাল দুই লাখ টাকায়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে একটা বড় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম জিতেশের কাছে অ্যাপ্রোচ করল। তারা সিরিজ এ ফান্ডিং হিসেবে দুই কোটি টাকা ইনভেস্ট করতে চাইল।
জিতেশ এবার আত্মবিশ্বাসের সাথে নেগোসিয়েশন করল। শর্ত ঠিক করল, ভ্যালুয়েশন ঠিক করল, আর চুক্তি সই করল।
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে বাবা-মাকে বলল, “বাবা, মা, আমি দুই কোটি টাকার ফান্ডিং পেয়েছি। আমার স্টার্টআপ এখন দশ কোটি টাকা ভ্যালুয়েশনের।”
বাবা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারলেন না। তারপর ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। “তুই পেরেছিস বাবা! আমি ভুল ছিলাম। তোর সাহস আর বিশ্বাসের ক্ষমতা দেখে আমি গর্বিত।”
মাও কেঁদে ফেললেন। “আমার সোনা! তুই আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেছিস!”
তমালিকা দাদার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, “দেখেছ, আমি বলেছিলাম না তুমি পারবে!”
সেই রাতে অনেকদিন পর জিতেশ শান্তিতে ঘুমাতে পারল।
কিন্তু জিতেশ জানে, এটা শুরু মাত্র। এখন তাকে স্কেল করতে হবে, পুরো ভারতজুড়ে ছড়িয়ে দিতে হবে “দোকানদার”। প্রতিযোগীরা আছে, মার্কেট চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু জিতেশের আর ভয় নেই।
একদিন অফিসে বসে টিমের সবাইকে জড়ো করে জিতেশ বলল, “ভাইয়েরা, আমরা যা পেরেছি তা আমাদের একসাথে লড়াইয়ের ফল। আমরা যখন শুরু করেছিলাম, তখন কেউ বিশ্বাস করেনি। কিন্তু আমরা হার মানিনি। এখন আমাদের লক্ষ্য, ভারতের প্রতিটা ছোট ব্যবসায়ীকে ডিজিটাল করা। আমরা শুধু একটা কোম্পানি নয়, আমরা একটা মুভমেন্ট তৈরি করছি।”
সবাই উৎসাহে হাততালি দিল।
২০২৫ সালে এসে “দোকানদার” অ্যাপের পঞ্চাশ হাজার অ্যাক্টিভ ইউজার। পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, বিহার, অসম জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তাদের কাস্টমার বেস। জিতেশ এখন দেশের উদীয়মান এন্ট্রাপ্রেনিউরদের একজন।
কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে জিতেশের মধ্যে। সে শিখেছে, সফলতা রাতারাতি আসে না। লেগে থাকতে হয়, ব্যর্থতা থেকে শিখতে হয়, আর নিজের স্বপ্নে বিশ্বাস রাখতে হয়।
একদিন একটা কলেজে এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপের উপর বক্তৃতা দিতে গিয়ে জিতেশ বলল, “বন্ধুরা, আমি কোনো সুপারম্যান নই। আমি তোমাদের মতোই একজন সাধারণ মানুষ। যার স্বপ্ন ছিল, আর সেই স্বপ্নের জন্য লড়ার সাহস ছিল। যদি তোমরা কিছু করতে চাও, তাহলে মানুষের কথা শুনো, নিজের অন্তরের ডাক শোনো। ব্যর্থ হতে ভয় পেও না, কারণ প্রতিটা ব্যর্থতা তোমাকে সফলতার আরও কাছে নিয়ে যাবে।”
স্টুডেন্টরা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল।
আজ জিতেশ ঘোষ যখন তার অফিসের জানালা দিয়ে কলকাতার আকাশের দিকে তাকায়, মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলোর কথা যখন সে একা ছোট্ট ঘরে বসে কোড লিখত, যখন সবাই বলত সে পাগল, যখন নিজেকেই মনে হতো হয়তো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কিন্তু আজ সে জানে, সেই অন্ধকার দিনগুলো ছিল তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। সেই সংগ্রাম তাকে তৈরি করেছে, শক্তিশালী করেছে।
তার ফোনে মেসেজ আসে রাহুলের কাছ থেকে: “ভাই, নতুন ক্লায়েন্ট মিটিং ঠিক হয়েছে। কাল সকাল দশটায়।”
জিতেশ হাসে। কাজ থেমে নেই, স্বপ্ন থেমে নেই। পথ দীর্ঘ, কিন্তু সে এখন জানে কীভাবে হাঁটতে হয়।
কারণ সে শুধু একজন এন্ট্রাপ্রেনিউর নয়, সে একজন স্বপ্নদ্রষ্টা – যে তার স্বপ্নকে বাস্তব করতে পারে। আর তার গল্প অসংখ্য যুবকের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে, যারা নিজেদের স্বপ্ন নিয়ে হাঁটতে ভয় পায়।
জিতেশ ঘোষের যাত্রা এখনও চলছে, আর এই যাত্রায় প্রতিটা পদক্ষেপ লেখা হচ্ছে সংগ্রাম, সাহস আর সফলতার নতুন কাহিনী।

