ডায়েরির শেষ পাতাগুলো – দ্বিতীয় পর্ব 

2

শেষ পাতাগুলো:

 মিমি চলে যাওয়ার বেশ কিছুদিন কেটে গেছে,সুরজিৎ অর্থাৎ স্নিগ্ধার স্বামী স্নিগ্ধাকে আবার নতুন করে লিখতেও শুরু করতে বলেছে। সুরজিৎ জানে স্নিগ্ধা ওর কাজটাকে কতটা ভালোবেসে করে, তাই সুরজিৎ চাইছে যে স্নিগ্ধা আবার স্বাভাবিক জীবনে খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসুক কিন্তু স্নিগ্ধা মিমির এভাবে চলে যাওয়াটা ঠিক মেনে নিতে পারছে না। এইতো মেয়েটা কত excited ছিল যে স্কুল এর final exam হয়ে গেলে বাড়ির সবার সাথে শান্তিনিকেতন যাবে কিন্তু সে তো আর….!! থাক সেসব কথা আর স্নিগ্ধা মনে করতে চায় না। অনেক চেষ্টা করেছে আবার লিখতে শুরু করার কিন্তুএখন আর লিখতে যেন ভালো লাগে না স্নিগ্ধার।

বেশ কয়েকদিন থেকেই সুরজিৎ এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করছে, স্নিগ্ধা যেন কার সাথে কথা বলে একা একা!! প্রথম প্রথম সুরজিৎ ভাবতো যে হয়তো স্নিগ্ধা আবার লেখা শুরু করেছে,তাই সেই গল্পের চরিত্রগুলোর সংলাপ হয়তো নিজেই পড়ে পড়ে দেখছে, এরকম স্নিগ্ধা আগেও অনেকবার করেছে। স্নিগ্ধা সুরজিৎকে বলতো, “আমার যদি নিজের লেখা পছন্দ না হয় তাহলে আমার পাঠকদের কিভাবে পছন্দ হবে আমার গল্প??”

তাই প্রথম দিকটা সুরজিৎ এই ব্যাপারটাতে অতটা আমল দেয়নি। সুরজিৎ খুব খুশি হয়েছিল এই ভেবে যে স্নিগ্ধা আবারো স্বাভাবিক জীবন এ ফিরে আসছে। কিন্তু গত দুইদিনের অভিজ্ঞতা থেকে সুরজিৎ এর এই ধারণা ভেঙে গেছে।

পরশুরাতের ঘটনা সুরজিৎ আর স্নিগ্ধা রাতে খাওয়া সেরে শুয়ে পড়েছে, হঠাৎই স্নিগ্ধার গলা শুনতে পেলো সুরজিৎ,স্নিগ্ধা কারোর সাথে ফিশফিশ করে কথা বলছে। মোবাইলে সময়টা দেখলো, ২টো ৪৫ বাজে।

“এতো রাতে স্নিগ্ধা কার সাথে কথা বলেছে??”

আর কিছু না ভেবে সুরজিৎ স্নিগ্ধার গলা শুনে এগিয়ে গেলো। স্নিগ্ধা মিমির ঘরে বসে কারোর সাথে কথা বলছে , সুরজিৎ মিমির ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো…. কিন্তু কোথায়? ঘরে তো কেউ নেই, তাহলে?? সুরজিৎ স্নিগ্ধাকে দুএকবার ডাকলো, -“স্নিগ্ধা !! এই স্নিগ্ধা!!”

কোনো সারা পেলো না। এইবার সুরজিৎ স্নিগ্ধার গা হাত দিয়ে ডাকতেই স্নিগ্ধা চমকে উঠে বললো, “ও তুমি!! আমি ভাবলাম কে এলো এই সময় আবার এই ঘরে??”

সুরজিৎ এবার অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো স্নিগ্ধাকে,

-“আমারও তো সেটাই প্রশ্ন স্নিগ্ধা?? এতো রাতে তুমি মিমির ঘরে বসে কি করছ??”
-“কি করছি মানে?? দেখছো না, মিমিকে ঘুম পারাচ্ছি, কথা বোলো না মিমি উঠে পড়বে।”
-“কি উল্টোপাল্টা বলছো?? কোথায় মিমি…. তুমি কি ভুলে গেছো যে মিমি আর বেঁচে নেই?”
-“সুরজিৎ তুমি কিসব আজে বাজে কথা বলছো? মিমি তো আমার কোলে মাথা দিয়ে ঘুমোচ্ছে!! দেখো সুরজিৎ এই মাঝরাতে এইসব ইয়ার্কি আমার একদম ভালো লাগে না।”

স্নিগ্ধা এরপর শূন্যে এমন ভাবে হাত বোলাতে লাগলো যেন সত্যিই মিমি ওর কোলের ওপর শুয়ে আছে আর স্নিগ্ধাও মিমির মাথাতে হাত বোলাচ্ছে এবং ঘুমপাড়ানি গান করছে।


স্নিগ্ধা এরপর সুরজিৎ কে বললো, “যাও  তুমি ঘুমিয়ে পরো,নইলে কাল সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারবে না; কাল তো তোমার আবার সকালেই মিটিং আছে। তুমি ঘরে গিয়ে শুয়ে  পরো  আমি মিমি কে ঘুম পাড়িয়েই আসছি। জানোইতো  মেয়েটা একদম ঘুমোতে পারে না আমাকে ছাড়া।”

সুরজিৎ আর কোনো কথা বলতে পারলো না,থমকে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষন। তারপর ঘরে এসে ভাবতে লাগলো স্নিগ্ধার তো মনে আছে যে আগামীকাল সুরজিৎ এর মিটিং আছে,তা হলে মিমি যে মারা গেছে সেটা ও ভুলে গেলো কি করে?? অনেক সময় সাংঘাতিক মনের আঘাত থেকেও এমন হয়!! স্নিগ্ধার কি তাহলে এমনটাই হলো?? এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে মনে নেই সুরজিতের।

পরের দিন সকালে যখন সুরজিতের ঘুম ভাঙলো, ও দেখলো স্নিগ্ধা আগেই ঘুম থেকে উঠে তার জন্য ব্রেকফাস্ট বানিয়ে রেখেছে। স্নিগ্ধাকে দেখে সুরজিৎ এর মনেই হলো না যে কাল রাতে স্নিগ্ধ কোনো অস্বাভাবিক আচরণ করছিলো!! সকালে রাতের কোনো কোথায় তুললো না আর সুরজিৎ; ব্রেকফাস্ট করে অফিস এ বেরিয়ে গেলো।

সুরজিৎ ভেবেছিলো যে অফিসের কাজ তাড়াতড়ি শেষ করে স্নিগ্ধাকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাবে, মিমি চলে যাওয়ার পর সারাদিন বাড়িতে একা একা থাকে তাই হয়তো হ্যালুসিনেট করছে; এই ভেবে সুরজিৎ অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লো।

 আজআবহাওয়াটা একদম যায় ভালো নেই, বৃষ্টি হতে পারে, তার ওপরে রাস্তাতে এতো জ্যাম ছিল যে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে গেলো সুরজিত এর। বাড়িতে ফিরে সুরজিৎ দেখলো যে বাড়ির বাইরে রিনা দাঁড়িয়ে আছে; রিনা সুরজিতের বাড়িতে কাজ করে। রিনা কে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সুরজিৎ বললো, “কিরে তুই বাইরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? স্নিগ্ধা  কি কোথাও বেরিয়েছে চাবি নিয়ে??”

মেয়েটা যেন খুব ভয় পেয়েছে গলা শুনে মন হলো, কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, “না দাদাবাবু আমি তো সময়মতো এসে গেছি, এসে দেখি দিদিমনি সব ঘর অন্ধকার করে দিয়ে মিমি দিদির ঘরে গিয়ে বসে আছে র কার সাথে যেন কথা বলছে!! আর মোমবাতি জ্বালিয়ে বসে আছে।  আমি দিদিমনিকে ডাকতেই দিদিমনি কেমন একটা গলায় বললো যে আমি যেন তাকে বিরক্ত না করি আর নিজের কাজ করে যেন বাড়ি চলে যাই।”

সুরজিৎ রিনার কথা শুনে রিনাকে বললো, “কিসব যাতা বকছিস? চল আমি দেখছি।”

সুরজিৎ ঘরে ঢুকেই এল জ্বালানোর চেষ্টা করলো, পারলো না। ফিউস গেছে ভেবে অটো মাথা ঘামালো না। এখন তার আগে স্নিগ্ধার কাছে যাওয়া প্রয়োজন। এক মুহূর্ত দেরি না করে সুরজিৎ মিমির ঘরের দিকে এগোলো; গিয়ে দেখলো মিমির বার্বি ডল এর সেট টাকে নিয়ে স্নিগ্ধা মেঝেতে  বসে মোমবাতি জ্বালিয়ে খেলছে, কথা বলছে গতরাতের মতো আর মেঝের ওপর রাখা সেই ডায়েরিটা যেটা মিমি লিখতো। সুরজিৎ অনুভব করলো যে মিমির ঘরের হাওয়াটা কেমন যেন ভারী আর তার ওপর তীব্র রজনীগন্ধার সুবাস নাকে এলো সুরজিৎ-এর।

সুরজিৎ এর মনে হলো স্নিগ্ধার গলার স্বরটা বদলে যাচ্ছে; তাহলে কি মিমি সত্যি এই বাড়িতেই আছে?? মিমি কি?? না আর ভাবতে পারছে না সুরজিৎ মাথা ঝিমঝিম করছে তার।

বাইরেও খুব ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়েছেতার সাথে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে; যেদিন মিমি মারা যায় ঠিক সেইদিনটার মতো। এমন সময় হটাৎ এক দমকা হাওয়া এসে জ্বলন্ত মোমবাতিটাকে এক নিমেষে নিবিয়ে দিলো আর ঠিক সেই সময়েই সুরজিৎ একটা হাসির শব্দ শুনতে পেলো। হাসির শব্দটা সুরজিতের চেনা; হাসিটা মিমির।

……… পড়ুন পর্ব ১

https://www.facebook.com/srijoni

……… অপেক্ষা করুন পর্ব ৩-এর জন্য

What’s your Reaction?
+1
32
+1
10
+1
15
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0

About Post Author

2 thoughts on “ডায়েরির শেষ পাতাগুলো – দ্বিতীয় পর্ব 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *