অচেনা রহস্য:

প্রায় ১০ বছর পর রাধিকা ব্যানার্জি নিজের শহরে বদলি হয়ে আসছে। রাধিকা ব্যানার্জি, ওরফে আর ব্যানার্জি, শ্রীরামপুর থানার নতুন অফিসার ইনচার্জ নিজের কাজে যে কোনদিন আপোষ করেন নি। সেই সুনামে তাকে অনেকবার ভালো কাজের পরেও বদলি হতে হয়েছে। তাতে তার মনে অনেক কষ্ট হতো। কিন্তু কোনদিন নিজের পদের অপব্যবহার তিনি করেননি। ছোট থেকেই ডানপিটে বলে এই বদনামটা তার ছিলই কিন্তু বলে না কেউ বদনাম মাথায় নিয়ে সারা জীবন কাটিয়ে দেয় আবার কেউ বদনাম কে হাতিয়ার করে জীবনে এগিয়ে যায়। 
এক্ষেত্রে রাধিকা দ্বিতীয় পথ টাই বেছে নেয়। তাই আজ সে এই জায়গায়। এইসব কারণের জন্যই শ্রীরামপুর থানায় আজ সবার মনেই একটু ভয় ছিল। সঠিক সময় ম্যাডামের গাড়ি গেটের সামনে আসতেই সকল শুভাকাঙ্ক্ষী,থানার আধিকারিক, কনস্টেবল,কিছু রাজনৈতিক স্থানীয় নেতা;অভ্যর্থনা করে ম্যাডামকে তার কেবিনে নিয়ে গেলেন। এরপর বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেছে,এর মধ্যে তেমন কিছু আর ঘটেনি রাধিকাও নতুন অফিসে নিজের কাজ গুছিয়ে নিচ্ছে।

থানার প্রবেশের একদম সোজাসুজি কেবিনের বাইরে সব সময় একজন সশস্ত্র কনস্টেবল দাঁড়িয়ে থাকেন। এছাড়াও রাধিকা নিজস্ব এক জার্মান শেপার্ড ডগ; যার নাম লাইকা সব সময় তার সাথে থাকে এই লাইকা অনেক ক্ষেত্রে অনেক কাজে রাধিকাকে প্রচুর হেল্প করেছে। 

অন্যদিকে শ্রীরামপুর কোর্ট থানার একদম কাছেই। শুধুমাত্র ৫ মিনিটের হাঁটা পথ। বেশ কয়েক মাস ধরেই একটি কেস কটে চলছে। সেই নিয়েই পুলিশ মহল মিডিয়া হাউস খুব উত্তেজনায় রয়েছে। কেসটা অনেকটা এইরকম। একজন ধনী ব্যবসায়ীর বাড়িতে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা চুরি ও ব্যবসায়ীকে মারার চেষ্টা করা। ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে ব্যবসায়ীর অ্যাকাউন্টেন্ট নিলয় দত্তকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সেই দিন রাতে নিলয় ব্যবসায়ীর বাড়িতেই ছিলেন। ব্যবসার কিছু অডিট এর কারণে তাকে সেই রাতে ব্যবসায়ীর বাড়িতেই থাকতে হয় আর সেই রাতেই এই ঘটনাটি ঘটে।

পুলিশ যা যা সূত্র পেয়েছে তাতে নিলয়কেই অপরাধী বলে ধরে নেওয়া যায়। আর কয়েকদিন কোর্টের  উকিল আর পুলিশের টানাটানি করলে নিলয়কেই দোষী সাব্যস্ত করা হবে আর কেসটাও হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে।

অন্যদিকে নিলয় প্রথম থেকেই বলে আসছে সে নির্দোষ,সে এই ব্যাপারে কিছু জানে না। কিন্তু একজন সামান্য অ্যাকাউন্টেন্ট, কতই বা তার মাইনে যে বড় উকিল বা ব্যারিস্টার রেখে কেশ লড়বে?অত টাকা কোথায়?তাই কেশ এদিকে ধীরে ধীরে সমাপ্তির দিকে এগোচ্ছিল। নিলয়কে শাস্তি পেতেই হবে সে দোষী হোক আর নির্দোষ হোক,তার শাস্তি হবেই। কিন্তু কেসটা পুরো ঘুরে যায় নিলয়ের দাদার একটা ফোনে।

ক্রিং ক্রিং শব্দ করে ফোনটা অনেকক্ষণ ধরে বেজে যাচ্ছে, প্রায় চার পাঁচ বার ফুল রিং হয়ে ফোনটা কেটে গেল। সবাই জানে অনিমেষ রাত্তির নটার পর খুব চেনাজানা না হলে ফোন ধরে না।  আর আননোন নাম্বার হলে তো একবারই নয়। কোর্ট থেকে ফিরে অনিমেষকে নিজের রান্না নিজেকেই করতে হয়। আর সারাদিনের নানা কেস নানা জুনিয়ারদের ডাকাডাকি আর রাতে ভালো লাগেনা। তাই সবাইকেই বলে রেখেছে রাতে যেন ফোন করে ডিস্টার্ব না করে। এমন কি ক্লাইন্টদেরও বলা আছে এ কথা। তবে আজ কার এত দরকার পড়ে গেছে অনিমেষকে এতবার
কন্টিনিউয়াসলি কল করে যাচ্ছে।
অনিমেষ ঘোষ বি.এ এল.এল.বি। বার কাউন্সিল এক্সাম পাস করে, প্রায় তিন বছর কলকাতা হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করে; তারপর গত সাত বছর হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টে দিল্লিতে প্র্যাকটিস করছে। অল্প বয়সেই এত সাফল্য খুব কম ছেলেরাই করতে পারে লয়ের ফিল্ডে ভাগ্য যেন সব সময় অনিমেষের মাথার উপরেই থাকে, জেজে কেসই নেয় সেই কেসে সাফল্য অনিবার্য।শান্ত স্বভাবের হলেও কেশের খুঁটিনাটি বার করা,তথ্য খুঁজে বার করা,এমনকি পুলিশ মাঝে মাঝে সেখানে হার মেনে যায় যেই কাজে সেই কাজও অবলীলায় অনিমেষ করে ফেলে। সেই কারণেই বড় বয়সের লয়ার,অ্যাডভোকেটরাও তার পরামর্শ নেয়।  এখন তার দুঁদে উকিল হিসেবে অনিমেষবাবুর বেশ খাতির হয়েছে কোর্টপাড়ায়।

এই নিয়ে সপ্তমবার ফোনটা বেজে উঠতেই অনিমেষ ফোনটা ধরতে গেল। যদি কোন জুনিয়র বা পুলিশ বা ক্লায়েন্টের ফোন হয় এই ভেবে। কিন্তু এসে দেখে একটা আননোন নাম্বার থেকেই ফোনটা আসছে। অনেক জনের ফোন নয়, কারণ একই নাম্বার থেকে ফোনটা এসেছে। ফোনটা হাতে নিয়ে  দু-তিনবার ভেবে অনিমেষ ফোনটাকে রিসিভ করে কানে দিল। 

ফোনটা কানে দিতে অনিমেষ শুনতে পেল একটা বয়স্ক মহিলার কন্ঠস্বর। হাউমাউ করে কাঁদছে। অনিমেষ বুঝতে পারল না কি বলবে? কি করবে? বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর বিপরীত দিকে বয়স্ক মহিলার পরিবর্তে একজন যুবকের গলা ভেসে এলো। 

-“হ্যালো অনিমেষ বলছিস?”

উত্তরে অনিমেষ বলল,

-“হ্যাঁ অনিমেষ বলছি। “

কিন্তু অনিমেষ এর গলা থেকে বেরোলো না প্রতিদিনের ফোন ধরার পদ্ধতি। 

-“ইয়েস অনিমেষ স্পিকিং। “

কারণ অন্য পক্ষ থেকে কথাটা বাংলায় এসেছে। যেটা দিল্লিতে একদমই অচল।  যাইহোক অনিমেষ একটু ধাতস্থ হয়ে বলল,

-“হ্যাঁ আমি অনিমেষ বলছি। আপনি কে বলছেন?”

অনিমেষের প্রায় তিন বছরের উপর হয়ে গেল বাংলায় ফেরেনি। অনিমেষ কলকাতার ছেলে কিন্তু ছোটবেলায় একটা অ্যাক্সিডেন্টে বাবা মারা গেলে, অনিমেষের মা তাকে নিয়ে চলে আসে তার দাদুর বাড়ি শ্রীরামপুরে। ১৪ বছর বয়স থেকেই শ্রীরামপুরে থাকা। স্কুল বন্ধুবান্ধব আর বান্ধবী।…….

মা মারা যাবার পর সবকিছু ছেড়ে অনিমেষ দিল্লি চলে আসে। তখন থেকে প্রায় তিন বছর আর অনিমেষ দেশে যায়নি। তাই বাংলায় কথা শুনে অনিমেষ একটু কথার খেল হারিয়ে ফেলেছিল।

অনিমেষ হ্যাঁ বলার পর ওপর দিক থেকে যুবক বলে উঠলো,

-“আরে আমি নিখিল বলছি শ্রীরামপুর থেকে। “

-“ও নিখিল বল কি খবর রে, কিন্তু দাঁড়া, কে ওইভাবে  কাঁদছিল? আর এখনতো মনে হচ্ছে কাঁদছে,তোর পাশেই। “

-“হ্যাঁ রে মা। “

-“জেঠিমা?কেন রে কি হয়েছে?সবকিছু ঠিক আছে তো?কিছু প্রবলেম?আমায় বল। “

“হ্যাঁ তোকেই তো বলব বলে ফোন করেছি। আমাদের খুব বিপদ রে। তুই আমাদের শেষ ভরসা।”

-” কি হয়েছে?”

-“আমার ভাই নিলয়কে পুলিশ মিথ্যে কেসে ফাঁসিয়ে।…….সব কথা নিখিল  অনিমেষকে বলতে থাকে। শুনতে শুনতে অনিমেষ-এর চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে।  অনিমেষ মনে মনে ঠিক করে নেয় যে পরবর্তীহিয়ারিং ডেট এর আগেই শ্রীরামপুরে  ফিরতেই হবে।”

-“চিন্তা করিস না আর জেঠিমাকে কাঁদতে বারণ কর। আমি পরবর্তী হিয়ারিং এর আগেই পৌঁছে যাব। আর তোকে কথা দিচ্ছি আমি নিলয়কে সম্পূর্ণরূপে বেকসুর খালাস করেই আনব। আমার উপর ভরসা রাখ।”

-” তুই আমারই ভাই। (চোখের জল মুছতে মুছতে হালকা কাঁদো কাঁদো ভাবে। )

-“হ্যাঁ আমি তিন দিনের মধ্যেই শ্রীরামপুরে পৌঁছব।  আর শোন কেউ যেন জানতে না পারে।  আর আমি তোদের ওখানে উঠব বুঝলি। আর কান্নাকাটি করিস না আর জেঠিমা কেউ কাঁদতে বারণ কর। আমি পরবর্তী হিয়ারিং এর আগেই পৌঁছে যাব। আর তোকে কথা দিচ্ছি আমি নিলয়কে সম্পূর্ণরূপে বেকসুর খালাস করেই আনব। আমার উপর ভরসা রাখ।”

-” তুই আমারই ভাই। (চোখের জল মুছতে মুছতে হালকা কাঁদো কাঁদো ভাবে। )

-“হ্যাঁ আমি তিন দিনের মধ্যেই শ্রীরামপুরে পৌঁছব।  আর শোন কেউ যেন জানতে না পারে।  আর আমি তোদের ওখানে উঠব বুঝলি। আর কান্নাকাটি করিস না আর জেঠিমা কেউ কাঁদতে বারণ কর। “

ফোনটা রেখে অনিমেষ তিন-চারটে কল করল। দিল্লির কাজ তার জুনিয়ার কে বুঝিয়ে দিয়ে,অনিমেষের ডান হাত পারেক আগারওয়ালকে নিয়ে পরের দিনই রওনা হল কলকাতার উদ্দেশ্যে। এয়ারপোর্ট থেকে সোজা ট্যাক্সি করে শ্রীরামপুরে রেল স্টেশনে এবং সেখান থেকে টোটো নিয়ে নিখিলদের বাড়ি। লোক জানাজানি আটকাতে এই ব্যবস্থা। আশেপাশে পাড়া-প্রতিবেশী কারোরই সন্দেহ হলো না যে, সুপ্রিম কোর্টের এত বড় অ্যাডভোকেট নিলয়ের কেসটা পাল্টে দিতে এসেছে। খুবই সাধারণ পোশাক পরা দুইজন ভদ্রলোক নিখিলদের বাড়ির সামনে টোটো থেকে নামল বটে কিন্তু কারো কোন সন্দেহ হলো না। কারণ এই ধরনের সেনসেটিভ কেসে একটা ছোট খবর দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে। 

বাড়ি ঢুকে নিখিলকে দেখে গলা জড়িয়ে ধরে। নিখিলের মাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে এবং চোখের জল মুছিয়ে বলে,

-“চিন্তা করোনা জেঠিমা,আমি এসে গেছি আর কোন চিন্তা নেই। আর তার সঙ্গে সঙ্গে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে নিখিলের মা অনিমেষকে জড়িয়ে ধরে। 

এদিকে সবকিছু গুছিয়ে পারেক ও অনিমেষ দুজনেই বেরিয়ে পড়ল তথ্য সন্ধানে। তবে যাওয়ার আগে এতদিন যা ঘটেছে, তার সকল বিবরণ শুনে নেয় অনিমেষ ও পারেক। পারেক কে সাথে নেওয়ার কারণ পারেক ও বাংলাটা ভালোই বলতে পারে। যাতে তদন্তে কোন রকম অসুবিধা না হয়। রাস্তায় বেরিয়ে দুজন দুদিকে চলে যায় পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী,পারেক ব্যবসায়ীর বাড়ি। 

সবকিছু কয়েকদিন ধরে শোনার পরে অনিমেষ বুঝতে পারে তদন্ত ভুল দিকে এগোচ্ছে । তবে শুধু অনিমেষের এই ধারণা হয়নি, আরেকজনের এই ধারণা বদ্ধমূল হতে থাকে। আর সে হলো এসপি রাধিকা দত্ত। কিছু একটা দিক পুলিশ এবং উকিলপক্ষ যেন বেমালুম ভুলেই যাচ্ছে সেটা হল একজন বয়স্ক ব্যবসায়ী, একটা অল্প বয়সী ছেলে ও লক্ষ লক্ষ টাকা বাড়িতে থাকে, তাহলে অন্য চোর আসা এমন কোন অবিশ্বাস্য কাজ নয়।  প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে নিজস্ব তদন্ত ও কিছু পুরনো তদন্ত-এর  নথী  ঘেঁটে অনিমেষ হান্ড্রেড পার্সেন্ট নিশ্চিত যে কোন কারন না পেয়ে নিলয়কে ফাঁসানো হচ্ছে।  হতে পারে এর পিছনে অন্য কেউ থাকতে পারে।

সঠিক দিন সঠিক সময় অনিমেষ নিজের পরিচয় ও কর্ম ক্ষমতার জোরে অতি সহজেই পুরনো সমস্ত তথ্যাদিকে খারিজ করতে বাধ্য করে মাননীয় জুরিদ্বয়কে।  আর এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই মিডিয়া হাউসের লোকজন ক্যামেরা মাইক সমেত কোর্টের বাইরে হাজির হয়।  তার বেশ কয়েকটা কারণ – 

১.প্রায় দেড় মাসের সমস্ত তদন্ত রিপোর্ট একদিনের মধ্যে খারিজ।  ২.প্রায় যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দণ্ডিত আসামিকে বেকসুর মাফ করিয়া আনা। 

৩.আর সর্বোপরি সুপ্রিম কোর্ট তথা ভারতবর্ষের একজন স্বনামধন্য এডভোকেট এই কেসের সাথে জড়িয়ে পড়া। 

কেউ কোনদিন ভাবতেও পারিনি। এই গল্প হবে নয় আরেকদিন।  অবশেষে বেকসুর হিসেবে ছাড়া পেল নিলয়। নিখিল অনিমেষ তাদের সকল বন্ধু নিখিলের মা সবাই খুব খুশি আর এই খুশির মুহূর্তে একজনকে দেখে অনিমেষ স্তম্বিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর ছুটে কোর্ট চত্বরের বাইরে চলে এলো। 

 আর তারপরের দিনে অনিমেষ দিল্লি ফিরে এলো। কিন্তু অনিমেষ প্রায়ই  অন্যমনস্ক হয়ে থাকে।  কি যেন ভাবছে সারাক্ষণ। পারেক ও অন্য  সব জুনিয়াররাও  জিজ্ঞাসা করেছে; কিন্তু অনিমেষ এড়িয়ে গেছে বারবার।

নিলয়ের কেসের ঘটনা কেটে গেছে প্রায় সপ্তাহ দুই। একদিন রাধিকা নিজের কেবিনে বসে কাজ করছে। হঠাৎ করে তার মোবাইলটা বেজে ওঠে;ফোন ধরে “হ্যালো” বলতেই বিপরীত দিক থেকে একটা বয়স্ক লোকের গলা ভেসে আসে।

-“টিয়া কি তার অতীতের দেওয়া কথা ভুলে গেছে? স্কুলের পিছনের মাঠে।…….”

বলেই ফোনটা কেটে যায়। আর রাধিকা চেয়ারে বসেই যেন কেঁপে ওঠে।  হঠাৎ হাত থেকে ফোনটা পড়ে যায়, আর রাধিকার মনে ঘটতে থাকে একটা প্রলয়।  কে যেন বহুতলা বিল্ডিং এর ওপর থেকে তলায় পড়ে যাচ্ছে। সব যেন তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই সম্বিত ফিরলো বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কনস্টেবলের ডাকে। লাইকা হঠাৎ করে খুব হাঁকডাক, করছে কেউ সামলাতে পারছে না তাকে। রাধিকা ছুটে বেরিয়ে লাইকাকে শান্ত করল। এবং আবার এসে কেবিনে বসলো।  তারপর আবার ভাবতে থাকল কে ফোন করেছিল। রাধিকা ঘুরিয়ে ওই নম্বরে  কল ব্যাক করল কয়েকবার।  কিন্তু ফোন switch off; কি করবে এখন বুঝতে পারল না রাধিকা।  চিন্তায়-দুশ্চিন্তায় ও কাজের মধ্যে দিনটা কেটে গেল। ধীরে ধীরে কথাটা প্রায় ভুলেই গেল। 

আমাদের মনের কোন গভীর ক্ষত বা ধাক্কা আমরা যতই ভুলে যাই কিন্তু একবার কোনোভাবে সেই ঘটনা ঘটে গেলে আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। সেই দিন রাতে ঘুমের মধ্যে রাধিকারও তাই হল। ধরমর করে উঠে বসল বিছানায়। সারামুখে ঘাম। atteched washroom এ  গিয়ে চোখে মুখে জল দেয় রাধিকা।  সব অতীতের কথা পরিষ্কার ভাবে মনে পড়ে যায় রাধিকার। কে টিয়া? তার দেওয়া কি কথা? আর টিয়া বলে কে ডাকতো রাধিকাকে? রাধিকা ঘরে এসে বিছানায় বসে, আর মনে মনে ঠিক করে নেয় এই ফোন কলটার রহস্য ভেদ করবেই।  

পরের দিন সেই ভাবনা অনুযায়ী কাজ শুরু করে দেয় রাধিকা।  প্রথমে cyber crime depertment-এ inform  করে ফোনটা ট্রেস করার জন্য। কিন্তু সবকিছু একটু গোপনে, যাতে ব্যাপারগুলো পাঁচ কান না হয়। ফোনটা  switch off থাকার কারণে তথ্যগুলো পেতে দেরি হয় রাধিকার। পরের দিন cyber crime depertment থেকে খবর আসে  ফোনের মালিকের।  শ্রীরামপুরের nearest tower location থেকেই ফোন এসেছিল; এবং আরো তথ্য পেল রাধিকা ডিপার্টমেন্ট থেকে। সেই অনুযায়ী নিজের ফোন রহস্যের তদন্ত নিজেই শুরু করে দিল রাধিকা। তবে একটা information একটু খটকা দিচ্ছে রাধিকাকে, আর সেটা হল ফোনেরঅয়নের  male  নয় female. কিন্তু রাধিকা তখনও বুঝতে পারেনি জল কতদূর গড়াবে। একটা সোজা হিসাবে এই information টাকে খারিজ করে দিয়েছিল। যে একটা মেয়ের ফোন থেকে কি অন্য কোন বয়স্ক ব্যক্তি কল করতে পারেনা?

 নানা কথা ভেবে একটা ছোটখাটো প্ল্যানিং করে; রাধিকা বেরিয়ে পড়ে ফোনের মালকিনের বাড়ির address এ। যাওয়ার আগে নিজের  ইউনিফর্মের পরিবর্তে civilড্রেসে যায়।  একটু খোঁজাখুঁজির পর রাধিকা বাড়িটা খুঁজে পায়। দরজার কাছে এসে দরজার বেল বাজায়। কয়েকবার বেল বাজানোর পর দরজা খোলেন এক মধ্য বয়স্ক ভদ্রমহিলা। রাধিকার দিকে  কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞাসা করেন মধ্যবয়স্ক ভদ্রমহিলা,

-“কাকে চান?”

তার উত্তরের রাধিকা বলে,

-“নীলিমা বাড়িতে আছে?”

-“হ্যাঁ! তবে ওর খুব জ্বর। তুমি কি ওর অফিসের বন্ধু?” 

একটু ভেবে রাধিকা বলল

-“হ্যাঁ। “

বলতেই রাধিকাকে ভেতরে নিয়ে যান ভদ্রমহিলা।  ভদ্রমহিলা রাধিকা কে নিয়ে দু-তলায় নীলিমার ঘরে নিয়ে যায় আর বলেন,

-“তোমরা কথা বলো আমি চা  নিয়ে আসছি। ”  বলে ধীর পায়ে নিচে চলে যান।

 বাড়িটা খুব পুরনো নয়। কিন্তু মেরামতের অভাবে জীর্ণ হয়ে পড়েছে। দেওয়ালে মাঝে মাঝে ফাটল দেখা দিয়েছে।  কিছু কিছু জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়ছে।  লাল মেঝের ওপর দাঁড়িয়ে, রাধিকা দেখতে পেল শ্রীরামপুর রাজবাড়ির ভাঙ্গা অংশ। এইসব দেখে রাধিকা মনে একটা খটকা জন্মায় কিন্তু খটকা মন থেকে সরিয়ে ঘরের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় রাধিকা। ঘরের মধ্যে একটা খাট,একটা ছোট আলমারি, টেবিলে গোটা কয়েক বই কাগজ ও পেন। ঘরে ফ্যানটা একটু আস্তে ঘুরছে। দরজা ঠিক উল্টোদিকে একটা জানালা আর এই দুইয়ের মাঝে খাট।  দরজার দিকে পিঠ করে শুয়ে আছে একটা মেয়ে। রাধিকা দরজা ঠকঠক করতেই মেয়েটা ঘুরে তাকালো। একজন অচেনা মহিলাকে দেখে বিছানায় উঠে বসে বলল,

-“আপনি?আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না?”

তার উত্তরের রাধিকা বলল,

-“আপনি আমায় চিনবেন না। আপনার সাথে আমার খুব জরুরী দরকার আছে তাই আপনার বাড়িতে আসতে হলো।”

নীলিমা রাধিকা কে ঘরে আসতে বলল। রাধিকা ঘরে ঢুকে নমস্কার করে বলল,

-“আমি রাধিকা ব্যানার্জি।”

ঘরে আর কোনো বসার জায়গা না থাকায় রাধিকাকে বিছানার একধারেই বসতে  বলে নীলিমা। নীলিমা বলল,

-“হ্যাঁ বলুন আমি আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?”

রাধিকা তখন পুরো ঘটনাটা বলা শুরু করল। প্রথমে প্রশ্ন করল রাধিকা,

-“নীলিমা তোমার ফোনটা কোথায়?”

এই প্রশ্নে একটু হক চকিয়ে যায় নীলিমা। তার উল্টো প্রশ্ন করে,

-“আপনি কে? আপনার পরিচয়?”

রাধিকা শান্তভাবে বলে,

-“আপনি এত টেনশন করবেন না।  আমি শ্রীরামপুর থানার নতুন S.P.”

কথাটা বলেই i -card নীলিমার দিকে তুলে ধরল রাধিকা। 

ঘন্টাখানেক পর যখন রাধিকা থানায় ফিরল তখন তার সমস্ত প্ল্যানে কেউ যেন জল ঢেলে দিয়েছে। নিজের কেবিনে ঢুকে চেয়ারটা টেনে বসল রাধিকা। কার্ডটা দেখার পর নীলিমা উত্তর দেয়,

-“আপনি যে ফোনটার কথা বলছেন সেই ফোনটা গত ৩-৪ দিন হল চুরি হয়ে গেছে। আমি গত পরশুদিন থানায় গিয়ে লিখিত কমপ্লেনও করেছি। তবে কি আপনারা আমার ফোনটা পেয়েছেন?”

রাধিকা চমকে উঠে বলল,

-“সে কি?”

বলেই উঠে দাঁড়ায় ও থানায় ফোন করে। থানায় থাকা কর্মরত অফিসারকে জিজ্ঞাসা করলে অফিসার রেকর্ড চেক করে বলেন,হ্যাঁ ওই নামে একটা complain register আছে। ফোনটা রেখে রাধিকা নীলিমার দিকে তাকিয়ে বলল,

-কিন্তু ওই নাম্বার থেকে আমার কাছে একটা কল এসেছিল কালকে।”

শুনে নীলিমাও অবাক। তখনই বাইরে পায়ের শব্দ হল। নীলিমার মা চা নিয়ে এসেছেন। চায়ের প্লেটগুলো টেবিলে রেখে,নীলিমার মা আবার চলে গেলেন। তারপর কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। নিস্তব্ধতা ভাঙলো রাধিকা। 

-“তোমার ফোন কোথা থেকে চুরি হয়েছিল?”

-“অফিস যাব বলে ট্রেনের টিকিট কাটতে গিয়ে,কাউন্টারে দাঁড়িয়ে ফোন বার করতে গিয়ে দেখি ফোনটা নেই। লাইন থেকে বেরিয়ে এদিক-ওদিক দেখি কিন্তু কোথাও পাই না।  অনেককে জিজ্ঞাসা করি কিন্তু কেউই কিছু বলতে পারে না।  তারপর আমি একজনের থেকে ফোন নিয়ে বাড়িতে ফোন করি। কিন্তু বাড়িতে ফোনটা ছিল না। কারণ আমার স্পষ্ট মনে আছে আমি ফোন ব্যাগে নিয়েই বেরিয়েছিলাম।”

বলে থামলো নীলিমা। 

-“বাড়িতে কে কে আছে?”

 -“মা,দাদা আর এক ভাই। 

-‘আর বাবা?”

-‘না দু’বছর হল মারা গেছেন?”

-“তারপর তুমি কি করলে?”

-“যখন অনেক খোঁজাখুঁজির পর পেলাম না ফোনটা; তখন আমার নম্বরের কল করতে থাকি,ফোনটা বেজে যায় কিন্তু ফোনটা কেউ ধরে না। বাড়ি ফিরেও কয়েকবার ট্রাই করি তখন ফোনটা রিং হচ্ছিল, কিন্তু কেউ পিকআপ করছিল না। তারপর থানায় গিয়ে লিখিতভাবে missing complain করি। কিন্তু তখন নাম্বারটা switch off বলে। আপনি একটু দেখুন না যদি কিছু ভাবে ফোনটা পাওয়া যায়। “

কি একটা কথা ভেবে নীলিমা আবার বললো,

-“আপনি বলছেন ওই নাম্বার থেকে আপনার কাছে কল এসেছিল কাল, তবে কোন বাজে লোক আমাকে ফাঁসাতে চাইছে না তো?”

বলেই কেঁদে উঠলো নিলিমা। রাধিকা নীলিমাকে শান্ত করে বলল,

-“না না তোমার কোন ভয় নেই আমি আছি। আমি দেখছি; তোমার ফোনটার কি ব্যবস্থা করা যায়।  আর তোমার বাড়ির নাম্বারটা দাও; দরকার পড়লে আমি তোমাকে ডেকে নেব থানায়। তুমি কিন্তু ভয় পেয়ো না। “

বলেই রাধিকা নীলিমার বাড়ির ফোন নম্বরটা নিয়ে আবার থানার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়। চেয়ারে বসে বসে ভাবতে থাকে রাধিকা। 

-“টিয়া ঐ টিয়া! তোমায় কখন থেকে ডাকছি সাড়া দিচ্ছ না কেন?”

-“সাড়া দিলে তুমি কি আর আমার পিছনে পিছনে আসতে ছুটে?”

-“ও তাই বুঝি! তার মানে ইচ্ছে করে সাড়া দাও নি তুমি। তবে রে……”

বলেই টিয়াকে আবার তাড়া করে শুভ।  কিন্তু টিয়ার সাথে দৌড়ে কেউই এখনো পর্যন্ত জিততে পারেনি।  শুভও  কিছু দূর গিয়ে টিয়াকে আর দেখতে পেল না।  কিছুটা এই ভাবেই শুরু হয় টিয়া ও শুভর একটা প্রেমের অধ্যায়।

Audio Story Starts From Here:

Story InfoName
WriterDebanshu Ghosh
NarratorDebanshu Ghosh
Intro & EndingOlivia Das
CharactersName
RadhikaPriyanka Dutta
AnimeshDebanshu Ghosh
NiloyJoydeep Lahiri
NilimaOlivia Das
Nilimar MaOlivia Das

Find us on Facebook – click here 

আরো পড়ুন

What’s your Reaction?
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0

About Post Author

1 thought on “অচেনা রহস্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *