Visits: 4

চিঠি:

কিছু স্মৃতি মানুষের মনে চিরকালের জন্য থেকে যায়। যেগুলো কোনো নির্জন দুপুরে বা যখন খুব একলা লাগে তখন যেন মনের কোথাও উঁকি দিয়ে যায়। রবার্ট মরিসন একজন সফল ডিজাইনার ছিলেন। সারা পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষ তার কাজের কথা জানে। তার একটা বিশাল বড় ফ্যাশান হাউস আছে সেটা এখন তার ছেলে দেখাশোনা করে। তিনি এখন কাজের জগত থেকে বিশ্রাম নিয়েছেন। তার সঙ্গী হল বই ও তার লেখা ডায়েরি। তিনি তার বিগত চল্লিশ বছরের জীবন কাহিনী তার এই ডায়েরি গুলোর মধ্যে বন্দি করেছেন। মাঝে মাঝে উল্টে পাল্টে দেখেন সেই সব ঘটনা গুলো। কিছু শুধু আনন্দের আর কিছু কেবল বেদনার। এইরকম একদিন সন্ধ্যায় তিনি যখন তার প্রিয় লেখকের একটি বই পড়েছিলেন। তখন তার ছেলে ঢুকলো। সে জিজ্ঞেস করলো,” বাবা তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?” রবার্ট বললেন,” বল।” ছেলে বললো,” বাবা কাল তোমার আলমারি পরিষ্কার করার সময় এই চিঠিটা খুঁজে পেয়েছিলাম। এটা কে লিখেছিল তোমায়?” রবার্ট চিঠিটা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলেন,

-“প্রিয় রবার্ট,
আমার নাম চার্লস হুডসন। তুমি আমাকে চিনবে না।আমি তোমার বাবার পুরোনো বন্ধু। আমার এডিনবরা তে একটা ফ্যাশন হাউস আছে। আমি চাই তুমি সেখানে কাজ করো।তোমার দক্ষতা সম্পর্কে আমি জেনেছি আর আমি আমার পুরোনো বন্ধুকে সাহায্য করতে চাই। তোমাদের পরিস্থিতির কথা আমি শুনেছি।তুমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে এসো। আমি তোমার থাকার ব্যবস্থা করে রাখব। আমার ঠিকানা চিঠিতে দেওয়া রইলো। 196, রোস স্ট্রিট, এডিনবরা, ইউ.কে
ইতি
চার্লস আঙ্কেল”


রবার্ট চিঠিটা পড়ে বললেন,

-” এই চিঠির সাথে আমার জীবনের একটি বড় ঘটনা জড়িয়ে আছে। এটা আমার পরিবারের লোক ছাড়া আর কেউ জানে না। আমি দুঃখ পাব বলে তারা সেই ঘটনার কথা কোনোদিন আর বলেন নি।এত দিন প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম ঘটনাটা।তুই যখন জিজ্ঞেস করছিস তাহলে শোন।।”

রবার্টের ছেলে উৎসাহ নিয়ে পাশের চেয়ারে গিয়ে বসলো। শুনতে লাগলো বাবার জীবনের অভিজ্ঞতা।রবার্ট বলতে শুরু করলেন,

-” তুই তো জানিস আমরা গ্রামে থাকতাম। তোর দাদুর জামাকাপড়ের দোকানটা আমি সামলাতাম। গ্রামে ভালো স্কুল ছিল না। পড়াশোনা হয় নি তেমন। গ্রামের পোস্ট মাস্টারের কাছে লেখাপড়া শিখেছিলাম। ওনার মেয়ে খুব ভালো আঁকতে পারত তার থেকেই আমার আঁকা শেখা এবং একসময় সুন্দর সুন্দর ডিজাইন আঁকতে শিখি। হ্যারি আঙ্কেলের কথা তুই জানিস। ওর মাধ্যমে শহরের কিছু লোক আমার ডিজাইন নিয়ে যেতো ও তাদের শাড়ীতে ব্যবহার করত। কিছু বাড়তি পয়সা রোজগার হতো। চিঠিটা যেদিন পেলাম সেদিন একটু অবাকই হলাম। কারণ বাবার এমন কোনো বন্ধু আছে বলে কোনোদিন শুনিনি। তাও বাবা কে নিয়ে গিয়ে ওটা দেখালাম। চিঠিটা বাবাকে দেখানোর পর আমি জিজ্ঞেস করলাম,

-“তুমি কি ওনাকে চেনো?”

বাবা বললেন,

-“হ্যাঁ খুব ভালো করেই। ও যখন শহরে যায় তখন আমি ওকে সাহায্য করেছিলাম। এত দিন পর ও আমাকে মনে রেখে যে তোকে চিঠি পাঠিয়েছে তাতে আমার খুব ভালো লাগছে। তুই আর দেরি করিস না। কাল সকালে বেরিয়ে পড়।”

আমি আর কিছু জানতে চাইনি। আমার প্রিয় বন্ধু হ্যারিকে বাবা মায়ের দেখাশোনা করা আর দোকানের দায়িত্ব দিয়ে এলাম।নতুন শহর,চিনি না কিছুই। মনে ভয় নিয়ে একে ওকে জিজ্ঞেস করে শেষে আঙ্কেলের বাড়ি পৌঁছলাম। বাড়িটা বেশ ছোট্ট, একতলা।পাশে একটা ছোট্ট বাগান আছে। আমি দরজার পাশের ছোটো ঘন্টাটা দুবার নাড়া দিলাম। ভিতর থেকে একজন মহিলা বেরিয়ে এসে বিরক্তিকর চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

-“এই ভর দুপুরে কাকে চাই?”

আমি একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললাম,

-“চার্লস আঙ্কেল আছে? আমি ওনার বন্ধুর ছেলে। একটু দরকার ছিল। এই যে এই চিঠি টা উনি আমাকে পাঠিয়েছেন।”

চিঠিটা পড়ে মহিলাটি বললেন,

-“ও এখন বাড়ি নেই। আমি ওর বউ লিনা। আমার সাথে ভিতরে চলো।”

আমি চুপচাপ ওনার সাথে ভিতরে চলে গেলাম। উনি আমার প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখালেন না। কিছু খেতে দেওয়া তো দূর এক গ্লাস ও দিলেন না। আমাকে বললেন,

-“চুপ করে ওখানেই বসবে। কিছুতে হাত দেবে না। আমি রান্নাঘরে আছি।”

প্রায় এক ঘন্টা বসে থাকার পর আঙ্কেল এলো। লিনা আন্টি রেগে গিয়ে বললেন,

-“এবার থেকে সবার নাম ধাম লিখে দিয়ে যাবে মিলিয়ে মিলিয়ে বাড়িতে ঢুকতে দেব। চারদিকে যা চোর ডাকাতের উপদ্রব যাকে তাকে বাড়িতে ঢুকতে দিতে পারবো না এই বলে দিলাম।”

চার্লস আঙ্কেল সেইসব কথায় কান না দিয়ে শুধু জিজ্ঞেস করলেন,

-“তুমি কি ডেভিডের ছেলে?”

আমি খালি মাথা নেড়ে বললাম,

-“হ্যাঁ।”

তারপর সোজা আমাকে নিয়ে একটা ঘরের মধ্যে চলে এলেন আর বললেন,

-“আজ রাতটা তুমি আমার বাড়িতে থাকো। কাল থেকে তুমি তোমার নতুন কোয়ার্টারে থাকবে। আমি তোমার সব জিনিসপত্র সেখানে পৌঁছে দিয়ে আসবো।”

শরীর ক্লান্ত থাকায় তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়লাম। পরদিন তাড়াতাড়ি উঠে স্নান সেরে জল খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। দোকানে পৌঁছে দেখি সেটা বেশ বড়। অনেক কর্মচারী। তারা নানা কাজে ব্যস্ত। আমি আঙ্কেলের সাথে একটা ঘরে গেলাম এবং সেখানে সব কাজ বুঝে নেওয়ার পর সারাদিন মন দিয়ে কাজ করলাম।রাতে আঙ্কেল আমাকে একটা বাড়িতে নিয়ে এলেন। দুতলা বাড়ি আর সেটা একদম রাস্তার ওপর। আঙ্কেল আমাকে নিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকলেন। বসার ঘরে একটা লোক বেশ একটু মস্তান গোছের চেয়ারে বসেছিল। আমাদের দেখে উঠে দাঁড়ালো। তারপর আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো,

-“হ্যালো!! আমার নাম ক্লিফ। আমি চার্লসের বন্ধু। তুমি আমার বাড়িতেই থাকবে। আমি এখানে একা থাকি। তোমার কোনো অসুবিধা হবে না। তোমরা ফ্রেশ হয়ে এসো তোমাদের খাবার রেডি করছি। চার্লস তুমি আমাকে একটু হেল্প করতে এসো।”

আমি হেসে বললাম,

-“ধন্যবাদ। আমার নাম রবার্ট। আপনার সাথে দেখা হয়ে খুব ভালো লাগলো। খেতে খেতে কথা হবে আপনার সাথে।”

আমি ফ্রেশ হয়ে এসে দেখলাম ক্লিফ খাবার বাড়ছে আর চার্লস স্যালাড কাটছে আর প্লেটে সাজিয়ে রাখছে। সেদিন খেতে খেতে অনেক গল্প হলো তবে ক্লিফের কাজ নিয়ে স্পষ্ট ধারণা পেলাম না। যাই হোক, রোজ রাতে খাবার টেবিলে বসে নানা বিষয়ে কথা বলতে বলতে আমি আর ক্লিফ ভালো বন্ধু হয়ে গেলাম। বেশ ভালোই দিন কাটছিল। সেদিন ছিল বড়দিন। আমি ঘুম থেকে উঠে মুখ হাত ধুয়ে জল খাবার খেয়ে বাড়িটা একটু সাজাতে শুরু করলাম। একটা কেক এনেছিলাম দুজনে খাব বলে। কিন্তু অনেকবার ডাকাডাকি করার পরও যখন ক্লিফের সাড়া পেলাম না তখন ওর ঘরে গেলাম ওকে ডাকতে। দরজাটা খোলা ছিল মনে হয়, একটু ঠেলা দিতেই খুলে গেলো। তারপর যেটা দেখলাম সেটা কল্পনার অতীত। মেঝেতে ক্লিফের রক্তাক্ত নিথর দেহটি পড়ে আছে, সারা ঘরে রক্ত আর জিনিসপত্র এদিক ওদিক ছড়ানো। ভয়ে আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেলো। আমি “ক্লিফ” বলে চিৎকার করে জ্ঞান হারালাম। যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি আমার ঘরের বিছানায় শুয়ে। আমার মাথার কাছে বসে আছেন পাশের বাড়ির রবিন আঙ্কেল। উনি আমার জ্ঞান ফিরেছে দেখে আমার দিকে এক গ্লাস জল এগিয়ে দিলেন আর বললেন,

-“পুলিশ তোমার সাথে কথা বলবে বলে অপেক্ষা করছে। আমার সাথে চলো।”

আমি ভয় পেয়ে বললাম,

-“আমি খুন করি নি। আমি কিছু জানি না।”

রবিন আঙ্কেল আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন,

-“ভয় পেও না। তুমি দোষ না করলে কেউ তোমায় শাস্তি দেবে না। এখন তাড়াতাড়ি চল।”

ওনার সাথে আমি বসার ঘরে এলাম। একজন ইন্সপেক্টর উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে বললেন,

-“আসুন মিস্টার রবার্ট। আমার নাম উইলসন গোমস। আপনাকে আমার কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার আছে।”

আমি স্থির ভাবে বললাম,

-“বলুন কি জানতে চান? তবে আমি বারবার বলব যে আমি খুন করিনি।”

ইন্সপেক্টর বললেন,

-“সেটা তো প্রমাণ বলবে। আপনি ওনার বাড়িতে ছিলেন। আর ও একটা জাত ক্রিমিনাল। ওর সাথে আপনার কি সম্পর্ক সবটা তো জানতে হবে আমায়।’ আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। উনি প্রশ্ন করতে শুরু করলেন।”

-“আপনি কত দিন চেনেন ক্লিফকে ?”

আমি উত্তর দিলাম,

-“এই দিন দশ মত। আমার এক পরিচিতের সাথে এসেছিলাম আর উনি এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।”

উইলসন আবার প্রশ্ন করলেন,

-“আপনার কখনো আগ্রহ হয় নি জানার যে ও কি করে? কাদের সাথে মেশে?”

আমি বললাম,

-“না সেরকম আগ্রহ ছিল না কোনোদিন। সকাল নটায় বেরিয়ে যেতাম কাজে আর ফিরতাম সাতটা। ওই খাবার টেবিলে যত টুকু কথা হতো ওইটুকু। মাঝে মাঝে ওর ঘরে অনেকেই আসতো, তারা অনেক রাত অবধি থাকতো, খাওয়া দাওয়া চলত।”

উইলসন মাথা নেড়ে বললেন,

-“বুঝলাম। আচ্ছা কোনোদিন কোনো অদ্ভূত আচরণ দেখেছেন ওর বা কোনো ঘটনা?”

আমি একটু ভেবে বললাম,

-“হ্যাঁ একদিন দেখেছিলাম।ওর সাথে একজনের খুব চেঁচামেচি হল। আর সে যাওয়ার সময়ে ওকে খুন করে ফেলার হুমকি দিয়ে গিয়েছিলো। আমি পরে ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে লোকটা কে আর কেনই বা সে এইরকম বললো। ক্লিফ খালি বলেছিলো এসব নিয়ে আমাকে চিন্তা করতে হবে না। ওসব ওর কাজে সবসময়ই চলতে থাকে।”

উইলসন উঠে দাঁড়ালেন। তারপর আমাকে বললেন,

-“আমরা আপাততঃ বডিটা পোস্টমর্টেমে পাঠাচ্ছি আর এই বাড়িটা তল্লাশি করে আমরা সিল করে দেব। আপনি কোথায় থাকবেন সেটা ভেবে নিন। আর একটা কথা শহরের বাইরে যাবেন না। আপনাকে আবার ডেকে পাঠানো হবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। কোনোরকম চালাকি করার চেষ্টা করবেন না।”

পুলিশ চলে যাওয়ার পর আমি আমার জিনিসপত্র নিয়ে চার্লস আঙ্কেলের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। তখন প্রায় বিকাল হয়ে গিয়েছিল। আন্টি গাছে জল দিচ্ছিলেন। আমাকে দেখে বিরক্ত হয়ে বললেন,

-“তুমি কি ব্যাপার? চার্লস বাড়ি নেই আর ও দুদিন ধরে বাড়ি ফেরেনি। কোথায় গেছে কিছু বলতে পারব না। আমার অনেক কাজ আছে। এখন বিদায় হও তো।”

আরো নানা রকম কথা বলতে বলতে লিনা আন্টি ভিতরে চলে গেলো। আমি বোকার মত দাঁড়িয়ে রইলাম।মনে মনে যীশু কে ডাকা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। কোথায় যাবো কি করব কিছু বুঝে উঠতে পারলাম না। শেষে মনে হলো একবার রবিন আঙ্কেলের সাথে দেখা করি। উনি যদি কিছু একটা ব্যবস্থা আমার করে দেন। ওনার বাড়ি পৌঁছলাম আটটা নাগাদ। দরজা খুলে দিলো ওনার চাকর। আমি বসার ঘরে এসে দেখি উনি একটা বই পড়ছেন। আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,

-“আরে তুমি এখানে? চার্লসের বাড়ি যাওনি?”

আমি হতাশ হয়ে বললাম,

-“হ্যাঁ গিয়েছিলাম। আঙ্কেল দুদিন হল বাড়িতে নেই। ওনার বউ আমাকে দেখে বিরক্ত হয়ে একরকম তাড়িয়ে দিলেন। তাই আমি আপনার কাছে এলাম আপনি যদি আমার কোনো ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। আমি তেমন ভাবে কাউকে তো চিনি না। আর বাড়ি ফিরতে পারব না পুলিশের বারণ আছে।”

রবিন আঙ্কেল একটু চুপ করে থেকে বললেন,

-“ঠিক আছে। যত দিন না খুনি ধরা পড়ছে তুমি আমার বাড়িতেই থাক। আমি আর আমার চাকর থাকি। আশা করি তোমার কোনো অসুবিধা হবে না।”

আমি রবিন আঙ্কেলকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে একটা ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিলাম। রাতে খাওয়া দাওয়া শেষ করে যখন ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি ঠিক সেই সময়ে খেয়াল হলো পাশের বাড়ির জানলায় একটা কারোর ছায়া। জানালা বন্ধ ভিতরে আলো জ্বলছে। আমি কিছুটা অবাক হলাম। বাড়িটা সিল করা, পুলিশ পাহারা রয়েছে।তাহলে কি ইন্সপেক্টর উইলসন এসেছেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম জানলার পাশে দাঁড়িয়ে। বাড়ির সামনে কাউকে চোখে পড়ল না। হতে পারে পুলিশ গুলো ঘুমিয়ে পড়েছে। তারপর দেখলাম একটা লোক একটা অদ্ভূত ধরণের পোষাক পরে বাড়ির পেছন থেকে বেরোচ্ছে। সে মনে হয় আমার উপস্থিতি বুঝতে পেরেছিল তাই দ্রুত পায়ে হেঁটে চলে গেলো। তার পোষাক দেখে আমার তখন একজনের কথা মনে পড়ল বটে কিন্তু সেটা মনের ভুল ভেবে আমি ঘুমোতে চলে গেলাম। পরের দিন সকালবেলা আঙ্কেল কে সব কিছু জানাতে উনি আমায় বললেন,

-“কি বলছো তুমি এইসব? এত রাতে ওই বাড়িতে কেউ কি করে আসবে? দাঁড়াও। আমি এখনই ইন্সপেক্টর উইলসন কে ফোন করে সব জানাচ্ছি।”

আঙ্কেল নাম্বারটা ডায়াল করতে যাবেন ঠিক সেই সময়ে কলিং বেল বেজে উঠলো। আঙ্কেল দরজা খুলে দেখলেন ইন্সপেক্টর উইলসন। তাকে ভিতরে নিয়ে এসে বসালেন। ইন্সপেক্টর উইলসন আমাকে বললেন,

-“আপনাকে একবার আমার সাথে থানায় যেতে হবে। আমরা আজ ভোরে চার্লস কে গ্রেফতার করেছি ওর একটা ডেরা থেকে। বেটা খুন করে লুকিয়েছিল। এখন ধরা পড়ে মিথ্যে বলছে। যাই হোক, ও একবার আপনার সাথে দেখা করতে চাইছে।”

আঙ্কেল বললেন,

-“কাল তোমায় থাকতে দিয়েছিলাম বটে কিন্তু তোমাকে আমি এখন বিশ্বাস করতে পারছি না। তুমি কি চার্লসের কোনো খারাপ কাজে যুক্ত যার জন্য চার্লস তোমার সাথে দেখা করতে চাইছে?”

আমি চমকে উঠে বললাম,

-“এসব আপনারা কি বলছেন? আমি চার্লস আঙ্কেলের দোকানে কাজ করতে এসেছিলাম। এসবের কিছুই জানি না।”

আঙ্কেল বললেন,

-“যার কথায় ভরসা করে এত দূর চলে এলে তার ব্যাপারে কোনও খোঁজ নাওনি। ভারী অদ্ভূত তো তুমি হে ছোকরা!”

আমি অসহায়ের মত বসে পড়লাম। মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ল আমার। অতিরিক্ত টাকা উপার্জনের আশায় এসে শেষে কিনা থানা পুলিশের পাল্লায় পড়ে জীবন বরবাদ হতে চলেছে। আঙ্কেল আমার পাশে বসলেন। আমি তখনও যেন ঘোরের মধ্যে ছিলাম। আঙ্কেল বললেন,

-“আমি বুঝতে পারছি যে তুমি ভেঙে পড়েছ কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই। তোমাকে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে।”

উইলসন বললেন,

-“দেখুন মিস্টার রবার্ট, আপনি যদি কোনো অপরাধ না করে থাকেন তাহলে আপনাকে কোনো চিন্তা করতে হবে না। পুলিশ আপনাকে কোনো রকম বিরক্ত করবে না। কিন্তু এখন আপনাকে আমাদের কথা শুনেই চলতে হবে।”

আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। চার্লস আঙ্কেলের সাথে থানায় দেখা করতে গেলাম। তিনি আমাকে দেখে উত্তেজিত হয়ে বলতে লাগলেন,

-“রবার্ট তুমি এসেছ। তুমি পারবে আমাকে বাঁচাতে। আমাকে সাহায্য করার কেউ নেই। তুমি আমার কথা শোনো একবার।”

আমি বিরক্তি নিয়ে বললাম,

-“আপনাকে বিশ্বাস করতে আমার ইচ্ছা করছে না। তবুও বলুন শুনি আপনি কি বলতে চাইছেন। আপনি তো আমার জীবনটা নষ্ট করতে চেয়েছিলেন।”

চার্লস আঙ্কেল কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

-“আমি জানি আমি দোষ করেছি। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। এই বিপদের দিনে আমি নিজের স্ত্রীকেও পাশে পাই নি।”

আমি বললাম,

-“যা বলতে চান তাড়াতাড়ি বলুন। আমার হাতে বেশি সময় নেই।”

চার্লস আঙ্কেল বলতে শুরু করলেন,

-“আমার আর ক্লিফের একটা যৌথ ব্যবসা ছিল। আমাদের একজন পরিচিত বন্ধু ছিল যে আমাদের ব্যবসার হিসাব রাখত।ওর নাম জন। একবার সে একটা গণ্ডগোল করে তার জন্য আমাদের অনেক টাকা ক্ষতি হয়। ক্লিফ ওকে তাড়িয়ে দেয় কিন্তু সে যাবার সময় বলে গিয়েছিলো ও প্রতিশোধ নেবে। আমার মনে হয় ও খুন করেছে। তুমি একবার ইন্সপেক্টর কে বলো। উনি আমার কথা কিছুতেই বিশ্বাস করছেন না।”

আমি উইলসন কে সব কিছু খুলে বললাম। উনি বললেন,

-“নিজে বাঁচার জন্য এইসব বলছে। ক্লিফ কে যে ছুরি দিয়ে মারা হয়েছে তাতে এই ব্যাটারই আঙুলের ছাপ আছে। যত সব নাটক।”

আমি তখন বললাম,

-“আপনি তাও একবার খোঁজ নিয়ে দেখুন। ও হয় তো চার্লস আঙ্কেলকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।”

উইলসন কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

-“চলুন তাহলে এবার আর একজন পাণ্ডা কে খুঁজে বার করি। পুলিশ হলে যে কত ঝামেলা পোহাতে হয় তা ভালই বুঝছি।”

চার্লস আঙ্কেলের থেকে জনের ঠিকানা পেয়ে তার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। যাওয়ার পথে হঠাৎ হ্যারির সাথে দেখা হলো। আমি ওকে গাড়ি থেকে ডেকে উঠলাম,

-“হ্যারি, হ্যারি!”

ও আমার গাড়ির দিকে তাকিয়ে এগিয়ে এলো। আমি গাড়ি থেকে নেমে ওকে উইলসনের সাথে আলাপ করিয়ে দিলাম। উনি হেসে বললেন,

-“আপনারা কথা বলে নিন। আমি গাড়িতে অপেক্ষা করছি।”

তারপর আমরা একটু দূরে গিয়ে কথা বলা শুরু করলাম। হ্যারি আমাকে বললো,

-“তুই কি এখানেই থাকিস?”

আমি মাথা নেড়ে উত্তর দিলাম,

-“হ্যাঁ এখান থেকে দু মাইল দূরে।”

হ্যারি বললো,

-“এখন কোথায় যাচ্ছিস তাও আবার পুলিশের সাথে?”

আমি বললাম,

-“আমি যে বাড়িটায় থাকতাম তার মালিক খুন হয়েছে। যেহেতু আমি থাকতাম তাই পুলিশ আমাকেও সন্দেহ করে। নিজেকে প্রমাণ করতে পুলিশকে সাহায্য করতে হচ্ছে। তাই ওদের সাথে যাচ্ছি। যাই হোক,তুই হঠাৎ শহরে? কোনো দরকার নাকি?”

হ্যারি হেসে বললো,

-“হ্যাঁ আসলে নতুন বছরের জন্য অনেক গুলো অর্ডার পেয়েছি। তার জন্য দামী কাপড়ের প্রয়োজন ছিল কিন্ত সেগুলো গ্রামে পাওয়া যায় না তাই একবার এলাম।”

আমি বললাম,

-“তা বেশ। উঠেছিস কোথায় এখানে?”

হ্যারি বললো,

-“ওই তো অর্কিড হোটেলে। আমি কাল ফিরব ভোরে। এখন কেনাকাটা করতে বেরিয়েছি একটু।”

আমি বললাম,

-“ঠিক আছে। আমি কাজ শেষ করে তোর সাথে দেখা করব। এখন আসি রে।”

উইলসন গাড়িতে বসেছিলেন। উনি জিজ্ঞেস করলেন,

-“ও কি আপনার ছোটবেলার বন্ধু?”

আমি বললাম,

-“হ্যাঁ। শহরে এসেছে কিছু কাজে। বিকালে একবার দেখা করব। এখন তাড়াতাড়ি চলুন। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

প্রায় মিনিট ত্রিশ পর একটা কলোনি তে এসে পৌঁছলাম যেখানে পরপর অনেকগুলো বাড়ি ছিল। ঠিকানা মিলিয়ে শেষে জনের বাড়ি খুঁজে পেলাম। একজন বুড়ো লোক বাগানে বসে আছে। আমাদের দেখে উনি বেরিয়ে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন,

-“পুলিশ কেন? কি চাই?”

উইলসন এগিয়ে গিয়ে বললেন,

-“আসলে পরশু রাতে ক্লিফ খুন হয়েছে। আমরা চার্লস কে গ্রেফতার করেছি কিন্তু সে জনের কথা বলছিল তাই আমরা এসেছি। ঠিকানাতে এই বাড়ির কথা বলা আছে। আপনি কি জন কে চেনেন?”

উনি মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বললেন,

-“হ্যাঁ চিনি। আমি ওর বাবা। কিন্তু এইসব আপনারা কি বলছেন! আজ এক সপ্তাহ ও বিছানায়। পা দুটো একটা দুর্ঘটনায় বাদ চলে গেছে। তার পক্ষে একটা মানুষ খুন করা একেবারেই অসম্ভব।”

উইলসন বললেন,

-‘আমি তাও ওনার সাথে একবার দেখা করতে চাই।”

উনি আমাদের ভিতরে নিয়ে গেলেন। ঘরে গিয়ে লোকটাকে দেখেই আমি চিনতে পারলাম। উত্তেজনায় মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো,

-“হ্যাঁ! হ্যাঁ! এই লোকটাই তো হুমকি দিয়েছিলো।”

জন বিছানায় কষ্ট করে উঠে বসে বললো,

-“আপনারা কারা? পুলিশ কেন এই বাড়িতে?”

আমি বললাম,

-“উনি ক্লিফের ব্যাপারে আপনার সাথে কথা বলতে চান। ক্লিফ পরশু রাতে খুন হয়েছে।’

জন আমার কথা শুনে হাততালি দিয়ে উঠলো। নিজের মনেই বলতে লাগলো,

-“বেশ হয়েছে। শয়তান টা শাস্তি পেয়েছে। আমি যা পারি নি সেটা অন্য কেউ করেছে। খুব ভালো হয়েছে।”

উইলসন জন কে বললেন,

-“আচ্ছা মিস্টার জন, আপনার এই অবস্থা হলো কি করে?”

কথাটা শুনে জনের চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে গেলো। মুখ বিকৃত করে বললো,

-“ওই শয়তানটা আমার এই দুর্দশা করেছে। আমি নির্দোষ ছিলাম। ও নিজে গণ্ডগোল করে আমাকে চোর সাজিয়ে বার করে দেয়। অপমানটা ভুলতে পারিনি তাই ওকে শাসাতে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে ওর লোক আমার এই অবস্থা করেছে।”

জনের বাবা ভয় পেয়ে বললেন,

-“দেখুন আমার ছেলে এখন সুস্থ নেই। সারাদিন ঘরের মধ্যে শুয়ে শুয়ে একে ওকে গালিগালাজ করে,নিজের মনে বকে। ওকে আমি কাল অন্য শহরে নিয়ে চলে যাব। আপনারা এখন আসুন।”

আমরা আশাহত হয়ে বেরিয়ে এলাম। তারপর আবার রবিন আঙ্কেলের বাড়ি যাওয়া হল। সেখানে লাঞ্চ করতে করতে আবার আলোচনা শুরু হল। উইলসন বললেন,

-“চার্লস জনের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজে বাঁচতে চাইলো কিন্তু জনের যা অবস্থা দেখে এলাম তাতে তার পক্ষে মানুষ খুন করা দুঃসাধ্য।’ আমি তখন বললাম,’ চার্লস আঙ্কেল কি সত্যি খুব খারাপ মানুষ ?”

রবিন আঙ্কেল খেতে খেতে বললেন,

-“তুমি কিরকম মানুষ হে? যে তোমাদের কোনোদিন কোনো খোঁজ খবর নেয় নি, সে হঠাৎ করে তোমাদের সাহায্য করবে বলে তোমাকে শহরে আসতে বলে দিলো আর তার কথা শুনে মনে হয় নি যে সে কোনো খারাপ কাজের জন্যও ডাকতে পারে? তুমি হয়তো জানো না ওর একটা কালো ব্যবসা আছে। দু বছর আগে কি একটা পাচার করতে গিয়ে ধরা পড়ে জেল খেটেছিল। তারপর থেকে নিজেকে আড়ালে রেখে অল্প বয়সী ছেলেদের কাজ দেবার নাম করে ডেকে এনে এইসব করায়। ওর বউ সব জানে তাই বাড়িতে কাউকে পছন্দ করে না।”

আমি শুনে হতভম্ব হয়ে বললাম,

-“এবার বুঝলাম। এই জন্য আন্টির নিজের স্বামীকে নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। তাই স্বামী দুদিন নিখোঁজ থাকা সত্ত্বেও পুলিশ কে ব্যাপারটা জানায় নি।”

উইলসন বললেন,

-“চার্লসের আরো অনেক পুরোনো রেকর্ড আছে। প্রমাণের ওভাবে ওগুলো চাপা পড়ে গেছে। আমার তো মনে হয় দুজনের মধ্যে কিছু ঝামেলা হয়েছিলো আর তাতেই এটা ঘটেছে। চার্লস ছাড়া আর কেউ এমন কি আছে যে খুন করতে পারে?”

রবিন আঙ্কেল বললেন,

-“ক্লিফের পরিবার ছিল বলে তো মনে হয় না। কারন আমি এখানে প্রায় ছয় মাস আছি। কোনোদিন কাউকে সেভাবে আসতে দেখিনি। এখানকার লোকেরা ওকে এড়িয়ে চলে। তেমন ভাবে ওর ব্যাপারে কেউ কথা বলতে চায় না। আমি তো শুধু দেখতাম চার্লস আর কিছু গুন্ডা গোছের ছোকরা ওর বাড়ি যাতায়াত করত। তখন বুঝলাম যে এরা কেউই ভদ্র কাজ করে না। আর ক্লিফ ওই দেখা হলে কথা বলত ওইটুকু।”

উইলসন আবার বললেন,

-“ব্যাপারটা জটিল হয়ে যাচ্ছে। ক্লিফ একটা জাত ক্রিমিনাল ছিল। ওর সব কটা শাগরেদ কে ধরে এনে তাদের আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়েছে কিন্তু চার্লস ছাড়া আর কারোর সাথে মেলেনি। এদিকে চার্লস বলছে সে খুন করে নি। তাকে ফাঁসানো হচ্ছে। ক্লিফের তেমন কেউ আত্মীয় নেই যে শত্রুতার জন্যে খুন করতে পারে। কিছুই বুঝতে পারছি না।”

খাওয়া শেষ করে যখন আমরা বসার ঘরে এলাম তখন আমার মাথার মধ্যে একটা ব্যাপার নাড়া দিলো। আমি বললাম,

-“আচ্ছা খুনটা তো লিনা আন্টি করতে পারে। ক্লিফ ওর অনেক বড় সর্বনাশ করেছে। ওর বরকে খারাপ পথে নিয়ে গেছে। আর নিজের স্বামীর প্রতি তার চরম ঘৃণা। সেক্ষেত্রে তার পক্ষে খুন করাটা স্বাভাবিক। স্বামী কে ফাঁসিয়ে তার সাথে সব সম্পর্ক চুকিয়ে সে একটা নতুন জীবন শুরু করতে পারে। আর আঙ্কেল যেভাবে ফেঁসেছে তাতে তার এত সহজে মুক্তি নেই।”

আমার কথা শুনে ওনারা দুজনেই সম্মত হলেন। উইলসন বললেন,

-“এটা আপনি ঠিক বলেছেন। মিসেস চার্লসের পক্ষে এটা করা খুব একটা অসম্ভব কিছু নয়।”

রবিন আঙ্কেল বললেন,

-“তাহলে অফিসার আপনি একবার লিনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করুন। হতে পারে আমাদের আশঙ্কা সত্যি।”

আমি মাঝখানে বললাম,

-“আমার একটা কথা ছিল।আমার বন্ধু কে তো আপনি দেখলেন। আমি কি ওর সাথে একটু দেখা করতে যেতে পারি? অনেকদিন পর ও শহরে এসেছে। আমি কথা দিচ্ছি আমি বেশি দেরি করব না।”

উইলসন বললেন,

-“ঠিক আছে। আপনি যেতে পারেন তবে দু ঘন্টার বেশি সময়ে দেওয়া যাবে না। আপনার সাথে আমার একজন কনস্টেবল যাবে।তারপর আপনি থানায় এসে দেখা করে যাবেন।আমি এখন লিনা ম্যাডামের সাথে কথা বলে আসি।”

উইলসন বেরিয়ে যাবার পরে আমি আর একজন কনস্টেবল হ্যারির হোটেলের দিকে রওনা দিলাম। প্রায় সন্ধে হয়ে এসেছিল। একটা হালকা বাতাস বইছিল। হ্যারির হোটেলে পৌঁছে ওর ঘরের দরজায় টোকা দিলাম। ও দরজা খুলে দিলো। কনস্টেবল বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।আমি ভিতরে গিয়ে দেখি ও জামাকাপড় গুছিয়ে রাখছে। বিছানায় একটা ছবি দেখলাম। হাতে নিয়ে দেখি ওটা ওর বোনের ছবি। ওর বোন কি একটা অসুখে মারা গেছে। হ্যারি ওর বোনকে খুব ভালোবাসত তাই ছবিটা সাথে রেখে দিয়েছে। হ্যারি আমাকে বললো,

-“ওই একজন আমার সবথেকে কাছের ছিল। সেও চলে গেলো। বাঁচাতে পারলাম না ছোট্ট বোন টাকে।মাঝে মাঝে মনে হয় বেঁচে থেকে আর কি বা করব।”

আমি ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম,

-“তুই নিজের জন্য বাঁচ। নিজে ভালো থাকার চেষ্টা কর। আমার মা বাবা তোকে নিজের সন্তানের মতই স্নেহ করেন।”

এইরকম আরও অনেক কথার বলে একটু সময় কাটিয়ে আমি থানার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। পৌঁছে দেখি উইলসন বসে আছেন গম্ভীর মুখে। আমাকে দেখে উনি জিজ্ঞেস করলেন,

-“আপনার বন্ধুর সাথে দেখা হলো?”

আমি বললাম,

-“হ্যাঁ হল। কিন্তু এদিকে কি খবর? কথা হল আন্টির সাথে?”

উইলসন আমাকে পুরো ঘটনা খুলে বললেন,

-“লিনা ম্যাডাম তখন কাজ করছিলেন। আমাকে দেখেও উনি বিশেষ বিচলিত হন নি। বুঝতে পারলাম যে এরকম পরিস্থিতি ওনার জীবনে অনেকবার এসেছে। উনি শুধু শান্ত গলায় আমাকে বললেন”,

-“আপনারা? কি দরকার বলুন।”

আমি বললাম,

-“আপনি কি জানেন যে আপনার স্বামী গ্রেফতার হয়েছে?”

উনি বললেন,

-“না জানি না। এটা ওর সাথে প্রায় হয়। তাই নতুন করে জানার ইচ্ছা নেই।”

আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম,

-“আপনি কি জানেন ক্লিফ খুন হয়েছে?”

উনি আবার বললেন,

-“হ্যাঁ শুনছিলাম। যে লোকের সর্বনাশ করে তাকেও একদিন শাস্তি পেতে হয়। আপনারা কি সেই কারণে চার্লসকে গ্রেফতার করেছেন?”

আমি মাথা নেড়ে বললাম,

-“হ্যাঁ।”

উনি বললেন,

-“ও। চার্লসের ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই। আপনি ওকে ফাঁসিকাঠে ঝোলালেও আমি কোনো প্রতিবাদ করব না। ক্লিফ নিজের দোষের শাস্তি পেয়ে গেছে। এবার চার্লস ও বুঝুক অসৎ পথে কোনোদিন শান্তি থাকে না।”

আমি তখন ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলাম,

-“আচ্ছা আপনার ও তো খুন করার উদ্দেশ্য আছে। ও আপনার এত বড় সর্বনাশ করলো। তার প্রতি আপনার রাগ থেকে আপনি খুনটা করতেই পারেন।”

উনি একবার তাকালেন আমার দিকে। তারপর হেসে বললেন,

-“আপনার কি মনে হয় খুন টা আমি করেছি? যদি সেটা ভেবেই থাকেন তাহলে ভুল ভাবছেন অফিসার। খুনটা সেদিনই করতে পারতাম যেদিন চার্লস কে পুলিশ ধরে নিয়ে গেলো। আমি আমাদের তিন বছরের ছেলেকে নিয়ে সাহায্যের জন্য এর ওর কাছে ছুটে গেছি। কিন্তু সবাই আমাকে চার্লসের বউ বলে তাড়িয়ে দিয়েছে।আমাদের একমাত্র ছেলে জোসেফ কে আমি বাঁচাতে পারিনি। ছেলেটা আমার বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে। মা হয়ে নিজের ছেলেকে কবর দিয়েছি। এর থেকে বড় দুর্ভাগ্য আর কি হতে পারে। আমার আর চার্লসের প্রতি কোনো টান বা আশা নেই। আপনাদের যা ভালো মনে হয় করতে পারেন।”

এই কথা গুলো বলে উনি কাঁদতে লাগলেন। আমি ওনাকে সান্ত্বনা দিতে দিতে বললাম,

-“আমি আপনার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি। আপনি তাহলে বলুন সেদিন কোথায় ছিলেন?”

উনি বললেন,

-“আমি ইয়র্কশায়ার গিয়েছিলাম। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।”

আমি শেষে বললাম,

-“আপনাকে একটা শেষ প্রশ্ন করতে চাই।”

উনি আমাকে বললেন,

-“বলুন”

আমি বললাম,

-“আপনি কি ক্লিফের পরিবার বা আত্মীয় দের নিয়ে কিছু বলতে পারবেন?”

উনি বললেন,

-“না, সেভাবে কিছু বলতে পারব না।ওর মা বাবা কেউ নেই। চার্লস বলেছিলো ওর বউ নাকি ওকে ঠকিয়ে কারোর সাথে একটা চলে গিয়েছিলো। ক্লিফ সেই দুঃখে আর রাগে নাকি এখান থেকে লন্ডন চলে যায়। ফিরে এসেছিল মাস দুয়েক আগে।”
আমার আর উইলসনের কথার মাঝে একজন কনস্টেবল এসে উপস্থিত হয়। সে বলে,

-“স্যার, আমরা ক্লিফের বাড়ির স্টোর রুম থেকে কিছু জিনিস পেয়েছি। আমি কি সেগুলো আপনার ঘরে নিয়ে আসবো?”

উইলসন বললেন,

-“হ্যাঁ। নিয়ে এসো। ভালো করে দেখতে হবে কিছু পাওয়া যায় কিনা।”

তারপর উনি আমাকে বললেন,

-“আপনি তাহলে এখন বাড়ি যান। যদি কোনো সূত্র পাই তাহলে সেটা আপনাদের আমি ফোন করে জানাবো।”

আমি একটু উৎসাহ নিয়ে বললাম,

-“আপনি যদি কিছু মনে না করেন তাহলে কি আমি একটু ওই জিনিস গুলো দেখতে পারি?”

উনি বললেন,

-“আপনাকে এখনও সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিইনি। মনে রাখবেন কোনো জিনিস সরানোর চেষ্টা করলে তার জন্য আপনাকে শাস্তি পেতে হবে।”

আমি অবাক হয়ে বললাম,

-“এ আপনি কি বলছেন? আমি এরকম কোনোদিনই করব না। আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন।”

উইলসন বললেন,

-“ঠিক আছে। তবে শুধু দেখবেন। কিছু তে হাত দেবেন না।”

কনস্টেবল জিনিস গুলো দিয়ে চলে যাবার পর আমরা দেখতে শুরু করলাম। দেখার মত তেমন কিছুই ছিল না। জমির কাগজ পত্র, কিছু চিঠি আর একটা ছবির অ্যালবাম আর কিছু মেয়েদের জিনিস। চিঠি গুলো দেখে বোঝা গেলো এক একটা সঙ্কেত। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম বেআইনি কাজের জন্য এগুলো ব্যবহার হয়েছে। শুধুমাত্র একটা চিঠিই একটু অন্যরকম। তাতে লেখা আছে,

-“তোমার সময় হয়ে এসেছে। এবার তুমি মরবে।”

আমি আর উইলসন একে অপরের দিকে একবার তাকালাম। বুঝতে পারলাম এটাই খুনির শেষ সতর্কতা। তারপর আমরা অ্যালবাম খুলে ছবি গুলো দেখতে শুরু করলাম। প্রথম পাতায় ক্লিফ আর ওর বউয়ের ছবিটা দেখে আমার বুক টা কেঁপে উঠলো। আমি বললাম,

-“এ ক্লিফের বউ!! তাহলে যে আপনি বললেন…..”

উইলসন আমার কথার মাথা মুন্ডু বুঝতে না পেরে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন,

-“আপনি কি ওনাকে চেনেন?”

আমি ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানালাম। আমি তখনই উইলসন কে বললাম,

-“আমাদের এখনই একটা জায়গাতে যেতে হবে। আপনিও চেনেন খুনি কে। চলুন ইন্সপেক্টর, আর দেরি করবেন না।”

আমরা দুজন এবং আরো দুজন কনস্টেবল কে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। রাত তখন প্রায় দশটা। রাস্তা ঘাট আস্তে আস্তে ফাঁকা হতে শুরু করেছে। সেই চেনা বাড়িটার সামনে আমাদের গাড়িটা থামল। আমি উইলসনকে বলেছিলাম যাতে পুলিশের গাড়ি বলে কেউ সন্দেহ না করে তার জন্য গাড়ির মাথার লাইট আর সাউন্ড যেন বন্ধ থাকে। গাড়ি থেকে নেমে বাড়িতে ঢোকার দরজার দিকে চলে গেলাম। দরজা খোলা ছিল। কাউকে চোখে পড়লো না। তাই সোজা চলে গেলাম তার ঘরে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। আমি দুবার টোকা দিতেই দরজা খুলে গেলো। ঘরের ভিতরটা অন্ধকার তাই খুনির মুখ ভালো করে বোঝা গেলো না। কিন্তু সে যে আমাদের চিনতে পেরেছে তা তার ব্যবহারে বোঝা গেলো। সে আমাদের দেখে ছুটে গেলো বারান্দার দিকে। আমিও তার পিছনে ছুটলাম। উইলসন ঘরে ঢুকে আলো জ্বালালো। আমি পিছন থেকে খুনির কলার চেপে ধরলাম। উইলসন তার দিকে বন্দুক উঁচিয়ে বললেন,

-“পালাবার চেষ্টা করলে কিন্তু একদম গুলি করে দেবো। আমার দিকে ফেরো।”

সে সামনে ঘুরতেই উইলসন যেন ভূত দেখার মত অবাক হয়ে গেলেন। আমি খুনি কে কনস্টেবল দের হাতে চালান করে উইলসনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। হেসে বললাম,

-“বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তাই না?”

উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

-“কিন্তু এটা কি করে সম্ভব? আপনার বন্ধু হ্যারি খুন করেছে ক্লিফকে ?”

আমি তখন হ্যারির ব্যাগ থেকে ওর বোনের ছবিটা বার করে উইলসন কে দেখাই। উইলসন দেখে অবাক হয়ে যায়। আমি বলি,

-“এটা হ্যারির বোন। কত মিল তাই না ক্লিফের বউয়ের সাথে?”

উনি শুধু বিস্ময়ে মাথা নাড়লেন। আমি বলে চলি,

-“হ্যারির বোনই ক্লিফের বউ। আমরা সবাই জানতাম ওর বোন কোনো বড় অসুখে মারা গেছে। কারন সে একবার এখানে আসার পর আর গ্রামে ফেরে নি। হ্যারির বাবা গ্রামের সবাইকে বলে যে ওর মেয়ে অসুখে মারা গেছে। আমি যখন ক্লিফের বউয়ের ছবি দেখি তখন সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যায়। হ্যারি মনে হয় বুঝেছিল আমি ওকে ধরে ফেলব তাই পালাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলো কিন্তু বুঝতে পারেনি ধরা পড়ে যেতে পারে।”

হ্যারি পাশ থেকে চেঁচিয়ে বললো,

-“বেশ করেছি খুন করেছি। আমি আমার বোনের খুনের প্রতিশোধ নিয়েছি। ওই শয়তানটা আমার বাবাকে টাকা আর মদের নেশায় ডুবিয়ে রেখেছিলো। আমার বোনকে দিনের পর দিন অনেক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। আমার একটুও আফসোস নেই ওকে খুন করে।”

উইলসন বললেন,

-“মুখ যখন খুলেই ফেলেছ তাহলে নিজেই বলো খুনটা কি করে করলে?”

হ্যারি বিছানায় বসে পড়লো। দু হাতে চোখের জল মুছে হ্যারি বলতে শুরু করলো,

-“আমি ক্লিফের সব খবরই রাখতাম। যখন শুনলাম ও ফিরে এসেছে আর ও আর ওর শাগরেদ মিলে আবার একজোট হয়েছে তখন আমিও ঠিক করে ফেলি ওকে শেষ করে দেবো। ওকে একটা হুমকি চিঠিও পাঠাই। আমি চার্লসের ব্যাপারেও জানতাম। যখন শুনেছিলাম ও রবার্ট কে এনে ক্লিফের বাড়িতে তুলেছে তখন একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম কিন্তু তাও চেষ্টা ছাড়িনি। আমি একদিন ক্লিফের বাড়ি যাই তখন দেখি ওরা বসে খাওয়া দাওয়া করছে। আমি দেখতে পাই চার্লস একটা ছুরি ব্যবহার করছে। আমি পরে সুযোগ বুঝে ছুরিটা সরিয়ে ফেলি আর ওটা ওরা জানতে পারেনি। বড়দিনের আগের দিন রাতে আমি ওর বাড়িতে আবার যাই। ও তখন মদের নেশায় আমাকে চিনতে পারেনি। আমি সুযোগ বুঝে ওর বুকে ছুরি বসিয়ে দি। তারপর ঘরের মধ্যে ওই অ্যালবাম টা খুঁজতে শুরু করি যেটা দেখলে রবার্ট সহজেই ধরে ফেলবে আসলে খুনি কে। কিন্তু তখন চার্লস ওখানে চলে আসে তাই আমি ওকে দেখে জানলা দিয়ে পালাই। পরের দিন ও এসেছিলাম কিন্তু খুঁজে পাইনি ওই অ্যালবামটা। সেদিন আমাকে রবার্ট দেখে নিয়েছিল। বুঝতে পেরেছিলাম হয় তো ধরা পড়ে যাব। কিন্তু আমি আমার বোনের সাথে হওয়া অন্যায়ের শাস্তি দিয়েছি। জানেন শেষ বারের মতো বোনটাকে দেখতে পাইনি। সেদিন কিছু করতে পারিনি কিন্তু এখন করেছি। আমার আর কিছু বলার নেই। আপনি আমাকে নিয়ে চলুন অফিসার। তুই ভালো থাকিস রবার্ট আর বাবা কে একটু দেখিস। আসছি।”

উইলসন যাবার আগে বললেন,

-“মিস্টার রবার্ট আপনার দায়িত্ব শেষ। আপনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পেরেছেন। আর আমি থানায় গিয়ে চার্লস কে ছেড়ে দেবো। ভালো থাকবেন। চললাম।”

-“বাবা, বাবা!”

ছেলে ডেকে বললো,

-“অনেক রাত হয়ে গেছে। খাবে চলো। আমি কাল একবার হ্যারি আঙ্কেলের খোঁজ নেবো। আমি ঠাকুমার কাছে শুনেছিলাম যে হ্যারি আঙ্কেল তোমার খুব কাছের বন্ধু ছিল। তুমি সেদিন নিজেকে বাঁচিয়েছিলে আসল খুনি কে খুঁজে বার করে কিন্তু হ্যারি আঙ্কেলের এই পরিণতি তুমি মেনে নিতে পারোনি। আমি জানি তুমি এখনো নিজেকেই দোষী ভাবো।”

ছেলের কথায় বর্তমানে ফিরে এলো রবার্ট। ছেলের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো। মুখ তুলে তাকালো ছেলের দিকে। চোখ দুটো তখনও জলে চিক চিক করছে।

Audio Story Starts From Here:

Story InfoName
Writerতৃষা লাহা
Intro & EndingOlivia Das
কথকOlivia Das
CharactersName
Robert, Young RobertSouradip Roy
Robert’s SonSoham Sandhukhan
Uncle CharlesNarayan Dutta
Robert’s Father, William GomesDebanshu Ghosh
Wife of Uncle CharlesPriyanka Dutta
Cliv, Constable, Father of JhonSuman Sandhukhan
HarrySurajit Mukherjee
JhonSoumik Baneejee
Robin UncleJoydeep Lahiri

Find us on Facebook – click here

আরো পড়ুন

What’s your Reaction?
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0

About Post Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *