Views: 2

লাশঘরের হাতছানি:

রহিত এই দুই মাস হল উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছে। রহিতের বাবা একটি বেসরকারী হাসপাতাল এর কাজ করে। হাসপাতালটা বেশ বড়ও পুরানো। রহিতদের বাড়ি থেকে মাত্র 10 মিনিটের পথ। রহিত প্রায় বাবার সাথে হাসপিটালে। সেই  কারণে প্রায় অনেকের সাথেই চেনা জান হেয়ে গেছে রহিত-এর। হাসপাতালের সব জায়গায়ই রহিতের চেনা। তবে হাসপাতালের পিছনের দিকটা খুব জঙ্গল বলে রহিত কোন দিন সাহস করেনি ওই দিকে যাওয়ার।

এই রকমই একদিন রহিত তার বাবার জন্য দুপুরে খাবার দিতে গিয়ে দেখে দুজন ওয়াড বয় একটা মৃত দেহকে স্টেচারে করে হাসপাতালের পিছনের দরজা দিয়ে বেড়িয়ে গেল। এই রকম ঘটনা প্রায়ই রহিত দেখে। কিন্তু কোন দিন কোন অস্বাভাবিকতা মনেও আসেনি বা চেখেরও পরেনি।

এই সময়ই হাসপাতা লটার একটা বর্ণনা দিয়ে রাখি। যাতে আপনাদেরও গল্পটা শুনে জায়গাটা মনে মনে কল্পনা করতে পারেন।
হাসপাতালটা জায়গাটা অনেকটা বড় তার মধ্যে বেশি ভাগটাই পরিতক্ত ও জঙ্গল আগাছায় ভরা। হাসপাতালটা তিনটি পার্টে বিভক্ত। প্রথম বিল্ডিং টা সব থেকে জন বহুল। emergency unit, medicine shop, admission counter, Maternity department, woman word, achild word, general word etc. চারতোল্লা বিল্ডিং। এটিই সবথেকে নতুন তৈরী।

প্রথম বিল্ডিং এর ঠিক পিছনে দ্বিতীয় বিল্ডিং। প্রথম বিল্ডিং-এর ভিতর দিয়েই যাওয়ার রাস্তা আছে। তবে বাইরে দিয়েও রাস্তা আছে। অ্যাম্বুলেন্স যাওয়ার, স্টের্চার ইত্যাদি নিয়ে যাওয়ার জন্য। এই বিল্ডিং টা দুতল্লা, প্রায় ৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো। তাই পুরোনো দিনের আমলের মত তৈরী, বড় বড় গেট,জানালা। এই বিল্ডিং-এর সামনের দিকে মূলত operation theatre, Office Room, Accounts room, ও কিছু godown আছে। সেখানে হাসপাতালের ব্যবহৃত জিনিস থাকে এবং এই বিল্ডিং-এর পিছন দিকটাতেই সেই লাস কাটা ঘর এবং মর্গ। সেখানে সবার যাওয়া নিষেধ।

তৃতীয় বিল্ডিং টি দ্বিতীয় বিল্ডিং-এর ঠিক পিছনে এবং সব থেকে পুরনো। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময় তৈরী ডঃ বাসুদেব সম্মাদার ইংরেজ সরকারের সহায়তায় এই হাসপাতাল তৈরী করেন। তখন প্রথম এই বিল্ডিংটি তৈরী হয় একতল্লা। কিন্তু পরে সেটি দুতল্লা হয়। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় হাসপাতালে বোমের আঘাতে এক দিক ক্ষতি গ্রস্থ হয়। এবং শোনা যায়  ভয়ঙ্কর আগুনে বেশ কিছু জিনিস ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এবং এটাও শোনা যায় কিছু রুগী মারা যায় আগুনে। কিন্তু সেটা সবার সামনে প্রকাশ করা হয়নি। প্রায় তার পর থেকে এই বিল্ডিংটি পরিতক্ত হয়ে পরে আছে। আগুন লাগার দাগ এখনও সুস্পষ্ট। এখন এই বিল্ডিংটি সেই ভাবে কিছুতে কাজে না লাগলেও কিছু গুদাম ঘর ও লাবারিশ লাশের জায়গা হয়েছে।

দ্বিতীয় বিল্ডিং দিয়ে তৃতীয় বিল্ডিং-এ যাওয়ার কোন ডাইরেক্ট রাস্তা না থাকলেও একটা ছোট দরজা আছে, বিল্ডিং এর পিছন দিকে যাওয়ার। আর দুই জন সিকিউরিটি গার্ড সব সময় সিপ্টিং করে ওখানটায় পাহারা দেয়। বাইরের দিক দিয়েও যাওয়া যায় কিন্তু সেখানে আরো কড়া করি। দিবারাত্রি ৪ থেকে ৫ জন সিকিউরিটি গার্ড এবং দুটি ট্রেনিং প্রাপ্ত কুকুর ঐ বাইরে গেটে পাহারায় থাকে। স্পেসাল অনুমতি ছাড়া ওখানে যাওয়া সম্পূর্ণ্য ভাবে নিষিদ্ধ। একে পরিতক্ত জায়গা তার মধ্যে জঙ্গল কোন রকমের এ্যাক্সডেন্ট না ঘটে তার জন্যই এই ব্যবস্থা।

এবার চলে আসি মূল গল্পে।

রহিত এর বাবা accountant হওয়ার জন্য তার ডিউটি ছিল দ্বিতীয় বিল্ডিং-এ সেদিন রহিত দুপুরে খাবার দিতে গিয়ে ঘটনাটি চোখে পরে। বিল্ডিং-এর পিছন দিয়ে লাসটা নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর কিছুখুনের জন্য সিকিউরিটি গার্ড দুটি  কিছু করতে পাশের বাথরুমে যায়। মিনিট দুই এর মধ্যেই ফিরে আসে।

রহিত-এর মনে অনেকদিন ধরেই কৌতুহল আছে এই তৃতীয় বিল্ডিংটির দিকে যাওয়ার। কি হয় ওখানে জানার জন্য বাবাকে অনেক বার জিজ্ঞাসা করার পরেও কিছু উত্তর পায়নি। একটা ছোট ছেলের কি বা সাহস হতে পারে যে সবার বারণ অগ্রাহ্য করে সিকিউরিটি ভেঙ্গে ঐ দিকে যাবে। কিন্তু এই ঘটনা চোখের দেখার পর রহিতের মনে আরো জেদ চেপে বসে ঐদিকে যাওয়ার। এর আগে শুনেছে রহিত লাবারিস লাস ঐ দিকে রাখা হয় কিন্তু এই প্রথম চোখে দেখা। তাই ঐ কিছুক্ষুণের মধ্যে কি কি ঘটল সেটা রহিত মাথার মধ্যে গেঁথে নিল। সপ্তাখানেক পর সন্ধ্যো বেলা ঐ একই ঘটনা। আড়াল থেকে দাড়িয়ে রহিত সব কিছু লক্ষ্য করলো। বাইরে টাঙ্গানো ঘড়িটা দেখলো। সম্পূর্ণ ঘটনা একই ঘটলো, কিছুদিন আগে যা ঘটেছিল। কিন্তু আজকে একটু নতুন জিনিস লক্ষ্য করল রহিত সম্পূর্ণ ঘটনাটা ঘটতে টাইম লাগত প্রায় তিন মিনিট। ঘটনাগুলি এইরকম:


১) দুইজন ওয়াড বয় স্টের্চার করে একটি মৃত লাসকে নিয়ে বিল্ডিং-এর পিছনের দরজা দিয়ে বেড়িয়ে যায়।
২) তারপর দরজা বন্ধ হতেই security guard দুটি হাত ধুতে বাথরুমে যায়।
৩) আবার কিছুক্ষুণের মধ্যেই ওয়াড বয় দুটি খালি স্টের্চার নিয়ে দরজা খুলে ঢুকে আসে। ততক্ষণে সিকিউরিটি গার্ড ও ফিরে আসে।

এবং এই সম্পূর্ণ ঘটনাটা শেষ হতে তিন মিনিটেরও কম টাইম লাগে। আর একটা জিনিস রহিত আজ লক্ষ্য করে ওয়ার্ড বয় দুটি হাতে glubs গুলি খুলে ফেলে পাশে থাকা ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। কি রকম যেন একটা জেদ চেপে ধরে রহিতকে। রহিতের তারপর থেকে হাসপাতালে আসা আর ঐ জায়গায় ঘুর ঘুর করা বেড়ে যায়। এই ঘটনার পর বেশি দিন অপেক্ষা করতে হল না। দুদিন এর মধ্যেয় আবার একই ঘটনা। যেন রিপ্লে হচ্ছে। টাইম প্রায় এক, সিকিউরিটি গার্ড এর ব্যবহার একই, ওয়ার্ড বয়দেরও একই। গত এক মাসে রহিত এই ঘটনা পঞ্চম বার দেখল।

এই এক বছর হল হাসপাতালের সামনে দিয়ে বড় একটা হাইওয়ে তৈরী হয়েছে। তার ফলে টুকটাক অ্যাকসিডেন্ট এর ঘটনা লেগেই থাকে। আর সামনা সামনী বড় হাসপাতাল বলতে এটাই। মাঝে মধ্যে বড় অ্যাসিডেন্ট এ মৃত্যু ঘটনাও ঘটে আর পোস্টমোটেমের জন্য এই হাসপাতালেই আনা হয়। কিন্তু রহিত এর খটকা এটাতেই লাগে যে, হাইওয়ে জন্য এ্যাকসিডেন্ট আর এ্যাকসিডেন্ট-এ মৃত্যু। এটা নয় মেনে নেওয়া যায় কিন্তু, যাদের মৃত্যু হচ্ছে এবং যাদের পোস্টমোটমের জন্য হাসপাতালে আনা হচ্ছে তাদের তো কোন না কোন ভাবে সনাক্ত করা যেতেই পারে, তাদের কোন ID Card বা পুলিশের সহায়তায় । তাহলে লাবারিস লাস, যেদিকে রাখে সেই দিকে নিয়ে যায় কেন। আর সর্বপরি এত লাস নিয়ে কি হয়। কোথায় ফেলে আসে ওয়ার্ড বয়রা। আর পুলিশ বা এদের সন্ধানে আসে না কেন। এই রকম কয়েকশো প্রশ্ন রহিত এর মাথায় ঘুরতে থাকে। কিন্তু এর উত্তর কে দেবে। কেউ না এমনকি রহিতের বাবাও নয়। হয় সব জেনে বা না জেনে বা ভয়ে সবাই চুপ করে আছে এবং অন্য দেরকে চুপ করিয়ে রেখেছে এতদিন।

একদিন রাতে রহিত ঠিক করে নেয় এই রহস্য ঘটনার গভিরে পৌঁছতেই হবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। রহিত তক্কে তক্কে থাকে কবে আবার এই ঘটনা ঘটে। বেশিদিন দেরি করতে হল না, এক সপ্তাহের মধ্যে সুযোগ এসে গেল।

সকাল ১১ টা নগাত রহিত বাবার একটা ডকুমেন্ট দিতে হাসপাতালে, আসে ফিরে যাওয়ার সময় দেখে দুই জন ওয়ার্ড বয় স্টের্চার নিয়ে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যে দুইজন দরজা খুলে বাইরে চলে যায়। আর সিকিউরিটি বাথরুমে যেতেই রহিত ছুটে বাইরে বেরিয়ে যায়, দরজা খুলে। এতটাই তাড়াতাড়ি কাজটা করল রহিত, যে কেউই টের পেল না।
দরজা দিয়ে বাইরে আসতেই কি কি জিনিস যে রহিতে সামনে আসতে চলেছে সেটা কল্পনাই করতে পারেনি। দরজা দিয়ে বেরোতেই দেখে একটা পুরানো টিনের সেডে। ১০-১৫ হাত দূরেই একটা বাড়ির পাঁচিল বাদিকে অনেকটা ফাঁকা জায়গা জঙ্গল হয়ে আছে। দরজা দিয়ে বেরিয়ে যে জায়গাটায় রহিত দাঁড়িয়ে আছে সেটা পাথরের ইঁট দিয়ে তৈরি রাস্তা, সোজা বাড়িটার সামনে দিয়ে চলে গেছে। ডানদিকে বাড়িটার পিছন দিক। সেদিকেও বেশ জঙ্গল হঠাৎ করেই স্টেচার এর আওয়াজ ও লোক দুটোর গলা শোনা গেল। এর সাথে রোহিতের নাকে এল এক গা গুলিয়ে ওঠা গন্ধ। এতক্ষন উত্তেজনার চোটে গন্ধটা টের পাইনি কিন্তু এখন যেন গন্ধটা তীব্র হয়ে উঠছে। আওয়াজ কাছে আসতেই রহিত ডানদিকে বাড়ি পিছন দিকের জঙ্গলাটর দিকে দৌড়ে পালালো এবং পকেট থেকে রুমালটা বের করে নাকে দেয়। বাড়িটার পিছন থেকে দেখে লোকদুটো স্টের্চার টা নিয়ে দরজা খুলে ভিতরে চলে গেল। এখন বুঝতে পারলো রহিত ওয়ার্ড বয় গুলো কেন মুখে mask বেধে থাকে। এবার রহিত অনেকটা নিশ্চিন্ত এখন আর কেউ এদিকে আসবে না। ভুল বসত হঠাৎ করে নাক থেকে রুমালটা সরে যায় রোহিতের, আর সঙ্গে সঙ্গে বট্কা দূর গন্ধটা আবার ওর নাকে যায়, এবার রহিত নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। কয়েক বার ওয়াক তুলে বমি করতে চেষ্টা করে। কিন্তু হয় না। যেন পেটের ভিতর থেকে সবকিছু উঠে আসবে। রহিত নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টা করে। রুমালটা ভালো করে নাকে চেপে ধরে রহিত। তারপর চারদিকে চোখ ঘোরাতে থাকে। সামনের দৃশ্যটা অনেকটা এইরকম, বাড়ি বা বিল্ডিংটা অনেকটা লম্বা। রহিত যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকেই বিল্ডিংটা শুরু হয়েছে। বাউনডারি পাঁচিলটা বেশ অনেকটা দূরে এবং কাটা তার দিয়ে ঘেরা। এবং পাঁচিলের ধার বরাবর বড় বড় গাছও আছে। রহিতের পিছন দিকটা দ্বিতীয় বিল্ডিং-এর পিছন দিক, তবে কোন জানালা, ঘুলঘুলি পর্যন্ত নেই। সোজা বেশ অনেকটা দূরে একটা কি যেন উঁচু হয়ে আছে। এবং তার গা বেয়ে লতা পাতা জঙ্গল উঠেছে। এই সব দেখতে দেখতে রহিতের শরিরটা যেন পাক খেতে থাকে। হঠাৎ করে একটু পাশে ঝুপ করে কিছু পরার শব্দ হতেই রহিত চমকে ঘুড়ে তাকালো সেদিকে। ঝোপঝাড় আগাছর মধ্যে কিসের শব্দ হল বোঝা গেল না। রহিত উপরে তাকাতেই দেখে বিল্ডিং-এর একটা খাঁজে বসে কয়েকটা কাক মিলে কিছু খাচ্ছে। আর একটা কাক মুখে করে নিয়ে যেতে গিয়ে মুখ থেকে খসে পরে রহিতের পাশটাতে, তারই শব্দ হয়েছিল। রহিত দুপা এগিয়ে দেখে কি পরেছে। একটু এগোতে দেখতে পায় রহিত এবং দেখেই আবার গা গুলিয়ে উঠে রহিতের। কোন প্রাণী চোখের সাদা বলটা খুবলে এনেছিল কাকটা। রক্ত সমেত পরে আছে জিনিসটা। রহিত কয়েকপা পিছনে সরে এসে ছুট লাগাল বিল্ডিং টার পিছন বরাবর। কিছুটা গিয়েই একটু দাঁড়ালো। উঁচু ঢিপিটার কাছে গিয়ে বুঝতে পারলো ওটা একটা কুয়ো জাতীয় কিছু এবং তার মধ্যে থেকে একটা পাইপ উপরে উঠে গেছে, ধোঁয়া বা গ্যাস বার করার জন্য। এই বিল্ডিং টার পিছন দিকে জানালা আছে কিন্তু ভিতর থেকে বন্ধ ওই জায়গা থেকে দুতিন পা এগোতেই আর একটা জিনিস দেখে রহিত থমকে দাঁড়ালো। একটু দূরে বাউনডারি পাঁচিলের দিকে একটা গাছের তলায় তিনটে কুকুর কিছু যেন খাচ্ছে। সারা মুখে রক্ত লেগে আছে। একটু ভালো করে দেখতে সামনে এগোলো। তারপর রহিত যা দেখল তাতে রহিতের সারা শরীর পাথরের মত শক্ত হয়ে গেল এবং শিরদারা বেয়ে ঠান্ডা শ্রোত বয়ে গেল।

একটা মানুষের মৃতদেহ কে চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে। আর একটা জিনিস লক্ষ্য করলো রহিত, বডিটার অনেকটা অংশই মাটিতে পোতা আছে। সেইখান থেকে বার করে কুকুর গুলো খাচ্ছে। ততক্ষণে বডির বেশ অনেকটা কুকুর গুলো খেয়ে ফেলেছে। বডিটা পুরো পচে গিয়ে গন্ধ বেরোচ্ছে। কুকুর গুলোকে যেন কি পৈশাচিক লাগছে। কুকুর গুলোর এক মুখ রক্ত, কশের লম্বা লম্বা দাঁতগুলো বেরিয়ে এসেছে। কি ভয়ঙ্কর দৃশ্য। হঠাৎ করেই একটা কুকুর রহিতের দিকে মুখ তুলে তাকালো। আর তখনই রহিত এর মনে হল কুকুর গুলো এখনই যেন রহিতের উপর ঝাপিয়ে পড়বে। আর গলা টুটিটা ছিড়ে ফেলবে। এবং ওকেও ওই ভাবেই চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে।

এই অবস্থাতেও শরীরে সব শক্তি দিয়ে নিজেকে টেনে ওই খান থেকে বিল্ডিং এর দিকে ঝোপটার পিছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে। কি ভয়ঙ্কর। এই সব দেখবে রহিত কল্পনাও করতে পারেনি। ওর মাথা ঘুরছে। গা-তো গুলো ছিলই। কিছু ক্ষণ চুপ চাপ দাঁড়িয়ে মনে আর একটু সাহস সঞ্চয়করে মুখ বাড়িয়ে দেখে কুকুর গুলো আবার ওদের কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে। তখনই এক দৌড়ে বিল্ডিংটা আর এক প্রান্তে এসে পৌঁছায়। এই দিকে এসে দেখে আর এক কৃর্তি। সামনের ফাঁকা জায়গাটা মাঠ, কবরস্থান না শ্বশান বোঝা যাচ্ছে না। চারিদিকে মানুষের মাথার খুলি, হার, কবর, আরো কত কি। তারমধ্যে কুকুর গুলো এই কবর থেকে হয়তো মৃত লাস গুলোকে নখ দিয়ে খুড়ে মাটির তলা থেকে বার করে তাদের পেট চালান করে দেয়। এই জঘন্য দৃশ্য, গন্ধ রহিত আর সহ্য করতে পারছে না, কিন্তু রহিত এটাও জানে যদি এখন যদি হাড় মেনে নেয় তাহলে ও আর বেঁচে থাকবে না। তাই এক পা এক পা করে এগোতে থাকে যাতে বেড়োনোর কোন রাস্তা খুজে পায়। কিন্তু না কিছুই পেল না রহিত, অনেক ক্ষণ খোঁজা খুঁজির পরেও। ততক্ষণে রহিত দেখে সে বিল্ডিং টার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বিল্ডিং টার সামনের দিকে প্রায় ৪-৫ টা বড় বড় লোহার সাটার দেওয়া গেট। সবকটাই বন্ধ একটা বাদে। যে দিক দিয়ে ওয়ার্ড বয়রা আসে সেই দিক থেকে দ্বিতীয় সাটারটা খোলা। রহিত এখন যেদিকে আছে সেই দিক থেকে চতুর্থ।

এই দিকে জায়গাটা অনেকটাই পরিষ্কার। মাঠের মধ্যে হাড়গোড় কিছুই পড়ে নেই। এই দিকের বাউন্ডারি পাঁচিলটাও পিছনের মতই দূরে। এদিকে আসতেই রহিতে গাটা আরো জড়ে গুলিয়ে ওঠে। রহিত ওয়াক ওয়াক করে একটা জায়গায় বসে পড়ে। কিন্তু কিছউ বের হয় না পেট থেকে। একটু জল হলে খুব ভালো হত কিন্তু এখানে কোথায় জল পাবে। উঠে এই খোলা সাটারটার দিকে এগিয়ে যায় ধীরে ধীরে। এগিয়ে আসতে রহিত বুঝতে পারলো, বিল্ডিং টার যদি সামনের দিক এটা হয় তাহলে রহিতে ডান দিকের ফাঁকা জায়গা দিয়ে গেলেই ঐ বড় সাটার ও কুকুর দিয়ে বন্ধ গেটটা পাবেও সেই খান দিয়ে পালাতে পারবে, এই নরক থেকে।

পালানোর আগে রহিত এর মনে হল, একবার খোলা সাটার-এর মধ্যে কি আছে সেটা দেখা যাক, সেই মতো ধীরে ধীরে ওই দিকে এগিয়ে গেল। কাছে পৌঁছাতেই পচা বটকা গন্ধটা আরো তীব্র হয়ে উঠল। তাতেও নাকে রুমাল চেপে ভিতরে মুখ বাড়ালো। ভিতরে জায়গাটা একটু অন্ধকার মত ছিল। আর বাইরে রোদের আলো তাই ভিতরের সব কিছু পরিষ্কার ভাবে বুঝতে দুই তিন মিনিট টাইম লেগে গেল। আর যখন পরিষ্কার হলো আর যেটুকু চোখে পড়ল তাতেই রহিত ভয়ে আঁতকে প্রাণ পন বেগে ছুটতে শুরু করল। ফাঁকা জায়গার গেটটার দিকে। চোখটা ধাতস্ত হতে রহিত দেখে ছিল, ঘরটা বেশ বড়, আর অন্ধকার। দু একটা আলো জ্বলছে এদিকে ওদিকে। আর সাটারটা খোলার জন্য সামনেটা একটু আলো আছে। তাতেই যা দেখতে পেল রহিত হিৃৎপিন্ড প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। এদিকে ওদিকে পরে আছে মানুষে নগ্ন মৃত দেহ। ভিতরে প্রায় লাসের স্তুপ এক এক জায়গায় থেকে মাংস যেন গলে গলে পরছে। কোন কোন লাসের তো আর গায়ে মাংস অবশিষ্ঠ নেই। মাংস পুরো গলে গিয়ে কঙ্কাল বেড়িয়ে পরেছে। চোখ গেল একদম সামনের একটা লাসের দিকে তার গা থেকে চামরাটা কে খুলে নেওয়া হয়েছে। আর শুধু পরে আছে রক্তাক্ত নগ্ন মাংসল পিন্ড মানুষে অবয়ব নিয়ে। চারদিকে মেঝেতে রক্ত, পচাগলা মাংস। সব নিয়ে ঘরটা যেন পাশবিক নরকে পরিণত হয়েছে। এই সব দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। ১৮ বছরের এই বাচ্চা ছেলেটা।

ছুটতে লাগালো প্রাণ পণ বেগে। রহিত যখন গেটের কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন দূর থেকেই দেখতে পেল তিন চার জন সিকিউরিটি গার্ড তখনও পাহাড়া দিচ্ছে। আর কুকুর গুলো বাধা আছে। কিভেবে  রহিত রুমালটা মুখে ভালোকরে বেঁধে আরো জোরে দৌঁড় লাগাল ।গেটের কাছাকাছি আসতেই কুকুরগুলো ডাকতে শুরু করলো কিন্তু সিকিউরিটি গার্ড গুলি কিছু বুঝতে পারার আগেই রহিত গেট টপকে, দ্বিতীয় বিল্ডিং এর রাস্তা তারপর প্রথম বিল্ডিং এর ভিতর রাস্তা টপকে একবারে বড় রাস্তার গিয়ে একটু হাঁপ ছারলো। আর পিছনেতাকালো কেউ পিছনে আসছে কিনা। সিকিউরিটি গার্ড গুলো প্রথমতো হকচকিয়ে গেছিল। আর কুকুর গুলোও বাধা ছিল তাই ওকে কেউ ফলো করতে পারেনি। নিশ্চয় কয়েক মিনিটের মধ্যে অ্যাকশন নেবে এবং কুকুর গুলোকেউ খুলে দেবে। প্রথম ও দ্বিতীয় রাস্তাতে লোক জনের ভিড় থাকলেও কুকুরগুলো তারা করতে পারে। এই ভেবে রহিত আবার দৌড়তে শুরু করলো।

উপস্থিত বুদ্ধি ভালো থাকার জন্য রহিত গেট টপকানোর আগে হাতে কিছুটা মাটি মেখে নেয়। যাতে কুকুরগুলো রহিতের ঘামের গন্ধ পেতে না পারে। রাস্তা দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে রহিত কিছু দূরে বয়ে চলা নদীতে ঝাপ দেয়। ততক্ষণে সকাল পেরিয়ে দুপুর হয়ে গেছে। রহিত ভালোই সাঁতার জানতো তাই সাঁতার কেটে নদী টপকে উল্টদিকে ওঠে। ঐ জায়গার পাশেই এক শ্মশানে জলন্ত চিতায় মধ্যে তার জামাকাপড় জুতো ফেলে দেয়। কিছু ক্ষণের মধ্যেই সেই গুলো পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তারপর আবার জলে ঝাপ দেয় রহিত।

……………………..

মাঝ রাতে বিছানার উপর ধড়মড় করে উঠে বসলেন প্রদ্যুৎ বাবু। সারা গা ঘামে ভিজে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন হৃদপিন্ডটা মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসবে। প্রদ্যুৎবাবু বিছানায় বসে বসে কিছুই বুঝতে পারলো না, এতক্ষণ কি ঘটে গেল তার সাথে। নভেম্বরের হালকা ঠান্ডা তার সাথে পাখা চলছে ঘরে, তাও ঘেমে স্নান করে গেছেন প্রদ্যুৎ বাবু। তিনি কর্ম সূত্রে রাত করে ফেরেন বলে, বাড়ির বাইরের ছোট ঘরটাই ব্যবহার করেন। আজ কেও ফিরতে প্রায় রাত দেড়টা বেজে গেছিল। বাড়িতে বলাই ছিল, প্রদ্যুৎ বাবুর ফিরতে বেশি রাত হয়ে গেলে, বাকিরা সবাই যেন শুয়ে পরে। তাদের বিরক্ত না করে তিনি এসে duplicate চাবি দিয়ে দরজাটা খুলে বাইরের ছোট ঘরে শুয়ে পড়বেন। এই প্রক্রিয়া প্রদ্যুৎ বাবুর অফিসের অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার হওয়ার পর থেকে শুরু হয়। তাও প্রায় বছর তিন চারেক হয়ে গেল।
প্রদ্যুৎ সোম, শিশির পুর জেনারেল হাসপাতালের অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার। তার বাড়িতে আছেন, তার স্ত্রী, তার একমাত্র ছেলে ও একটি চাকর। বাড়ির অধিকাংশ কাজই বাড়ির চাকর রঘু দা করেন। কিন্তু তার বয়স হয়ে যাওয়ার জন্যে, আর একটি কাজের লোক রেখেছেন প্রদ্যুৎ বাবু। তার নাম মিনতি। তিনি সকালবেলা এসে সারাবাড়ি ঝাঁট দেওয়া, ঘর পোছা, বাসন মাজা, এছাড়াও বাজার দোকান করে     দিয়ে যান। আর রঘু দা বাড়ির ভেতরের কাজ অর্থাৎ রান্না করা, খাওয়ার দেওয়া, ঝারপোজ করা ইত্যাদি কাজগুলো করেন। বাড়িটা খুব বড় নয়। একতলা বাড়ি পিছন দিকে ২টো শোবার ঘর। তার সামনে dining room, ডান দিকে বাথরুম ও রান্নাঘর। আর একদম সামনেই ছোট ছোট দুটি ঘর আছে। তার মধ্যে একটিতে রঘু দা থাকেন। আর একটি এতদিন ফাঁকাই থাকত। কিন্তু প্রদ্যুৎ বাবু ম্যানেজার হওয়ার পর কাজ থেকে ফিরতে দেরি হয় বলে ওই ঘরেই থাকার ব্যবস্থা করেছেন। এই ঘরটি dining room-এর লাগোয়া। প্রদ্যুৎ বাবুর বাড়ি থেকে হাসপাতাল অর্থাৎ ওনার অফিস-এর দূরত্ব ৮-১০ মিনিটের পথ।
একটু সুস্থ বোধ করতেই প্রদ্যুৎ বাবু উঠে মাথার কাছে রাখা জলের গ্লাস থেকে জল খেয়ে, একটু ঘাড়ে ও কানে দেন। তারপর আবার বিছানায় এসে বসেন। কয়েক দিন ধরে কাজের মেয়েটা কাজে না আসার জন্য দোকান বাজার সব প্রদ্যুৎ বাবুকেই করতে হচ্ছে। হয়ত তার জন্যেও কিছু সমস্যা হতে পারে, নাকি অন্য কিছু কারণ। তারপর প্রদ্যুৎ বাবু আবার বিছানায় শুয়ে পরলেন।


পরদিন সকালে প্রদ্যুৎ বাবু বাড়ির সামনের বাগানটায় বসে খবরের কাগজ পরছেন, হঠাৎ করে বাড়ির ভিতর থেকে চাকর রঘু এসে খবর দিল আজকেও কাজের মেয়ে মিনতি কাজে আসেনি। সেই শুনে রাগে গজ গজ করতে করতে মিনতির বাড়ির দিকে হাটা লাগালেন প্রদ্যুৎ বাবু। কিছুক্ষন পর মিনতির বাড়িতে গিয়ে দেখে আর এক ঘটনা। গত দুই দিন দরে পাওয়া যাচ্ছে না তাকে। সেই নিয়ে মিনতির বাড়ি ও এলাকা হুলুস্থুলু হচ্ছে। এই সব শুনে পুলিশি ঝামেলার ভয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে বাড়ি চলে আসেন প্রদ্যুৎ বাবু। তারপর বাড়িতে এসে কাউকে কিছু না বলে স্নান করে অফিসে বেড়িয়ে গিয়েছিলেন।


প্রদ্যুৎ বাবু ও প্রদ্যুৎ বাবু, গায়ে হাত দিতেই প্রদ্যুৎ বাবু ধরমর করে উঠে দাঁড়ায়। পাশ থেকে প্রশ্ন আসে ঘুমিয়ে পরে ছিলেন নাকি? ডান দিকে মাথা ঘুরিয়ে দেখেন রামেশ্বর বাবু ওরফে রাম বাবু , হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।
প্রদ্যুৎ বাবু : হ্যাঁ…. ইয়ে…. একটু চোখটা লেগে গেছিল আরকি। কাল রাতে ঠিক ঘুমটা হয়নি, তাই….।
রামেশ্বর বাবু: সেকি? ঘুম হয়নি কেন?
প্রদ্যুৎ বাবু ঃ একটু স্বাভাবিক হয়ে বলেন, না না সেই রকম কিছু নয়।

প্রদ্যুৎ বাবু ঃ আমার ছেলে খাবার দিয়ে গেছে? উল্টে প্রদ্যুৎ বাবু প্রশ্ন করেন রামেশ্বর বাবুকে।
তারপর গলাটা একটু নামিয়ে  রামেশ্বর বাবু  বলেন আচ্ছা মশাই শুনছি নাকি আপনার বাড়ি কাজের মেয়েটাকে দুদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না?
প্রদ্যুৎ বাবু চুপ। রামেশ্বর বাবু আরো বল্লেন গলা নিচু করে,
কানা ভুশোয় শুনছি ঐ মিনতির নিখোঁজের আগে থেকেই একটা অচেনা লোকের সাথে কথা বলতে দেখা গিয়েছিল। কেউ কেউ আবার বলছে লোকটিকে নাকি মিনতিকে শাড়িটারিও দিতে দেখেছে। আপনি এই ব্যাপারে কিছু জানেন নাকি?
চোখ দুটিকে বড় বড় করে রামেশ্বরবাবুর দিকে তাকিয়ে গলাটা ভারি করে বললেন প্রদ্যুৎ বাবু দেখুন মশাই আমার খবরকে রাখে তার ঠিক নেই। অন্যের খবর আমি জানিনা।
তারপর অফিস ঘরের বাকি দিরে দিকেও তাকিয়ে দেখে সবাই গল্প শুনতে ব্যস্ত । প্রদ্যুৎ বাবু বড় বড় চোখ করে তাকাতেই, সবাই আবার নিজের নিজের কাজ শুরু করে দেন। তারপর প্রদ্যুৎ বাবু রামেশ্বরবাবুকে পাশ কাটিয়ে বাইরে বেরিয়ে যান। তার কিছুক্ষণ পরেই রামেশ্বর বাবুও কাচু মাচু মুখ করে বেরিয়ে যান ঐ ঘর থেকে। বাইরে এসে দেখেন প্রদ্যুৎ বাবু বাইরের  এক বেঞ্চে বসে আছেন। রাম বাবু আবার প্রদ্যুৎ বাবু সামনে গিয়ে  দাঁড়িয়ে বললেন, নিজের কাজে মন দিন, অযথা চিন্তায় নিজেকে জড়াবেন না।
সেই দিন রাতে প্রদ্যুৎ বাবুকে আবার একটা কাজে অফিসে থাকতে হল। প্রায় পৌনে দুটো নাগাত বাড়িতে ফেরেন। হাত মুখ ধুয়ে, জল খেয়ে শুয়ে পরে।
কিছুক্ষণ পরেই আবার ঘুমের মধ্যে সেই ঘটনা চোখের সামনেই ফুটে উঠে। গত রাত্রের পুনরাবৃত্তি আবার ঘটতে থাকে। ধরমর করে উঠে বসা, ঘামে গা ভিজে যাওয়া ইত্যাদি। ধীরে ধীরে প্রদ্যুৎ বাবু প্রায়ই অন্যমনস্ক থাকতে শুরু করেন। কাজে ঠিকঠাক মন দিতে পারেন না। খাওয়া-দাওয়া ঠিকঠাক করেন না, কারুর সাথে কথা বলতে চনা না। ওনার বাড়িতেও তাঁর স্ত্রী, ছেলে জানেত চেয়েছে তাঁর এইরকম অন্যমনস্কতার কারণ। কিন্তু সবাইকেই তিনি এড়িয়ে চলেন ।
এইভাবেই কেটে যায় বেশ কয়েকটা দিন। একদিন সকালে রঘুদা চা নিয়ে প্রদ্যুৎ বাবুর ঘরে যান। কিন্তু অনেক ডাকাডাকির পরেও প্রদ্যুৎ বাবু দরজা না খোলায় জোরে জোরে দরজায় ধাক্কা দিতে থাকেন। চেঁচামিচির আওয়াজ শুনে ভিতরের ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন প্রদ্যুৎ বাবুর স্ত্রী ও ছেলে। রোহিত অর্থাৎ প্রদ্যুৎ বাবুর ছেলেও বেশ কয়েকবার দরজায় ধাক্কা দেন এবং প্রদ্যুৎ বাবু স্ত্রী হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন। তার ফলে আশেপাশের বাড়ি থেকে বেশ কয়েকজন ছুটে আসে। সবার যৌথ প্রচেষ্টায় কাঠের দরজা কর্কট শব্দ করে ভেঙ্গে পড়ে। ঘরে ঢুকে এইরকম বিভৎষ্য দৃশ্য দেখতে পাবে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। ঘরে ঢুকতেই দেখা যায়, প্রদ্যুৎ বাবু বিছানায় শুয়ে আছে এবং সারা ঘর ভেসে যাচ্ছে রক্তে। এই দৃশ্য দেখে সবাই হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
প্রদ্যুৎ বাবুর এক হাতে ধারালো বেড এবং অন্য হাতের শিরা কাটা। তখনও টপটপ করে রক্ত পড়ছে হাত থেকে। এই দৃশ্য দেখে প্রতিবেশীদের মধ্যে থেকে কিছুজন স্থানীয় থানায় খবর দেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই থানা থেকে পুলিশ ও হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সও চলে আসে। পুলিশের সাথে স্থানীয় হাসপাতালের ডাক্তারাও আসে। এবং প্রাথমিক ভাবে বডি পরীক্ষা করে তারা বলেন প্রায় দু’ঘন্টা আগে তার মৃত্যু ঘটেছে। পুলিশ উপস্থিত সকলের বয়ান নেওয়া শুরু করে। বিশেষ করে প্রত্যক্ষদর্শীদের।
প্রদ্যুৎ বাবুর স্ত্রীকে রঘুদা ততক্ষণে ভেতরের ঘরে নিয়ে যায়। তিনি পাগলের মতন কেঁদে চলেছেন তখনও এবং ছেলে রহিতও।
পুলিশ আসার পর ঘরের ভিতরের যে দৃশ্যগুলো তাদের নজরে আসে –
প্রদ্যুৎ বাবুর ডানহাতে তার দাড়ি কামানোর ধারালো একটা ব্লেড। বাঁ হাতের কবজির কাছের শিড়াগুলি অপারেশনের মতো করে কাটা। চোখ গুলো ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে। রক্তশূণ্য মুখটি হাঁ করা, যেন তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেছে। পুলিশ যখন ঘরে ঢোকে ততক্ষণে মাটিতে পড়ে থাকা রক্ত জমাট বাঁধা শুরু করেছে। বাঁ হাতটি বিছানার বাইরে ঝুলছে এবং টপটপ করে রক্ত ঝরছে। পরনের পায়জামা ও গেঞ্জিটিতেও রক্তের দাগ সুস্পষ্ট। এছাড়াও পুলিশ ঘর থেকে একটি সুইসাইড নোটও উদ্ধার করেন। যেখানে প্রদ্যুৎ বাবু নিজেই লিখে গেছেন।
‘‘সবাই আমাকে ক্ষমা কর।’’ ঘর থেকে আর সেই রকম কিছু সন্ধেয় জনক কিছু না পাওয়ায় এই ঘটনাকে সুইসাইড বলেই ধরে নেয় পুলিশ। বডি প্রশমটেম-এর জন্য হাসপাতালে পাঠায়। স্থানিয় প্রতিবেশী ও ওনার ছেলে ও ওনার স্ত্রীর সাথে কথা বলে পুলিশের ধারণা আরো বধ্যমূল হয় যে এটা সুইসাইড-এর ঘটনা। সেই রকম কিছু না পাওয়া  গেলে মানসিক চাপ-এর কারণেই প্রদ্যুৎ বাবু এই ভয়ঙ্কর ঘটনাটা ঘটিয়েছেন বলে ধরে নেওয়া হয় । পুলিশি তৎপরতায় দাহ সব কাজ নির্দিধায় সম্পন্ন হয় এবং বেশ কয়েক দিনের মধ্যে এই কেশটিও বন্ধ হয়ে যায়।
কেশ বন্ধ কিন্তু গল্প নয়।
সপ্তাহ দুই পর শিশির পুর থানার বড় বাবুর নামে একটা বেনামি চিঠি আসে থানায়। দেবদুলাল রায়, শিশিরপুর থানার বড় বাবু, চিঠি খুলে পরতে পরতে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে দেবদুলাল বাবুর ।
আমি কমলেশ সোম। আপনার কাছে অনুরোধ চিঠি টাকে পুরো পরবেন। এই নামটা আপনার কাছে অপরিচিত হলেও প্রদ্যুৎ সোম নামটার সাথে এত দিনে ভালোই পরিচিত হয়ে গিয়েছেন। তাই অনুরোধ রইল চিঠিটা পুরো পড়ার।
মহিলা ঃ Best student’s award goes to Kamolesh Som. আমাদের সবার প্রিয় ছাত্র কমলেশ অরফে প্রদ্যুৎ।

 ক্যালকাটা ম্যাডিক্যাল কলেজ ডিপাটমেন্ট থেকে top rank করা ছেলেটার জন্য এতো আয়োজন হয়েছিল।আমি বরাবরই ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম। তাই NEET exam পাস করে MBBSএর ভর্ত্তি হই। পাশ করার পর ভালো ভাবেই আমার ক্যারিয়ার শুরু করি। ধীরে ধীরে anatomyতে আমার বিশেষ আগ্রহ লাগায়, আমি সেই দিকেই আমার ক্যারিয়ার অগ্রসর করি। বেশ ভালো ভাবেই আমার দিন কাট ছিল। হঠাৎই একদিন আমার হাতদিয়ে এক জঘন্যতম কাজ হয়ে যায়। আমি কর্মসূত্রে যে ফ্ল্যাটে থাকতাম সেই ফ্ল্যাট-এর দেখাশোনা করার জন্য এক কাজের লোক রেখেছিলাম। ঘরে কাজ ও রান্নাবান্না করত। মাঝে মধ্যে মাইনে বারানো কথা বলত মেয়েটা। সেই টুকটাক কথা কাটাকাটি লেগেই থাকত। এই রকম একদিন সন্ধ্যোতে বাড়ি ফিরতেই আবার মাইনে নিয়ে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। কাজের চাপ থাকার জন্য মাথা এমনিতেই একটু গরম ছিল। তারপর বাড়িতে এই ঝামেলা। কাজের মেয়েটিকে গালে এক চর মারতেই মেয়েটি ঘুরে গিয়ে পরে পাশের টেবিলে, টেবিলের কোনটা মেয়েটির কপালের মধ্যে ঠুকে যায়। রক্ত বেরিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই মেয়েটি মারা যায়। বেশ কিছুক্ষণ আমি নির্বাক হয়ে দাড়িয়ে ছিলাম। এ আমি কি করে ফেললাম। কিন্তু কে জানে আমার মাথায় সেদিন কি চেপে ছিল। কি করি কি করি ভাবছি এমন সময় মাথায় এক ফন্দি খেলে গেল। Anatomy শিখতে গেলে একটা হিউম্যান বডি লাগে যেখানে কাটা ছেড়া করে বডি নানা রকম কে জানতে হয় সাধারণত যে সমস্ত উদার ব্যক্তি নিজের শরীর দান করে দেন, মৃত্যুর পর। সেই সমস্ত বডিতেই ট্রেনিং করানো হয়। খুব বড় লোকের ছেলে মেয়ের টাকার জোরে খুব গরিব লোকের বডিও কিনে নিত প্রচুর টাকা দিয়ে।
আমি তখন ভাবি এই মেয়েটি বডিটাকে যদি আমার সাবজেক্ট করে নিই তাহলে পুলিশে ধরতে পারবে না। ফ্রিতে নিজের একটা টেস্টং সাবজেক্টও হয়ে যাবে। যেমন ভাবা সেই রকমই কাজ। খুব সুন্দর ভাবে সব কিছুকে ম্যানেজ করে ফেললাম কয়েক দিনের মধ্যে। কেউ টেরও পেলনা। মেয়েটির বাড়ি থেকে পুলিশে কেশ করায় পুলিশ আমার বাড়িতেও এসেছিল কয়েক বার। কিন্তু প্রতিবারের পুলিশের প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে তৈরি ছিল। বডিটাকে আমি আমার পারসোনাল ল্যাবের বড় ডিপ ফ্রিজে রেখে দিতাম। কাজের সময় বডিটা বার করতাম। তাপর হয়ে গেলে ক্যামিকেল-এ প্যাক করে আবার ফ্রিজে রেখে দিতাম। এই ভাবে পরাশোনায় চলতে থাকলো এবং তার সাথে প্যাকটিস। ধীরে ধীরে বডিটার প্রতিটি অঙ্গ প্রতঙ্গ কেটে কেটে পরীক্ষা নিরিক্ষা চালাতাম। আমাকে যেন একটা নেশায় পেয়েছিল। কলেজের থেকে ল্যাব এই বেশিটা সময় কাটাতাম। গন্ধের জন্য মোটা মোটা মার্কস ব্যবহার করতাম কিন্তু ল্যাব-এ যাওয়া বন্ধ হয়নি। আসতে আসতে বাকি স্টুডেন্টদের থেকেও ভালো ফলাফল করতে থাকলাম। এত দিনে বডিটা প্রায় কঙ্গালে পরিণত হয়েছিল।
এমনকি বডিটার গা থেকে চামড়া প্রায় খুলে সেটা নিয়েও পরিক্ষা করেছিলাম। শরীরের কোন অংশই বাদছিল না। চোখ, মাথা, জ্বিভ, লিভার,হৃৎপিন্ড, কিডনি আরো কত কি। ডাকতার হিসাবে হয়তো আমি ভালোই ছিলাম এবং এই অভিজ্ঞতার জন্য শারীরিক জ্ঞান এত্ত কিন্তু কখন যে মানুষ থেকে পশুতে …. নিশৃংস পশুতে পরিণত হয়েগেছি বুঝতেই পারিনি। এই বডিটাতে যখন সব অঙ্গ কেটে আলাদা করে ফেলেছিলাম ততদিনে বডি শুকিয়ে কঙ্কাল হয়ে যাওয়ায়। মাথায় আর একটা পৈশাচিক চিন্তা এল। ‘‘আর একটা বডি চাই’’। তার জন্য কাজও শুরু করেছি, ….. এর জন্য।
একদিন দেখি আমার ফ্ল্যাটের নিচেই একটি ভিখারি পোটলা পুটলি নিয়ে বসে আছে। বেশ অনেক দিন ধরেই ওর উপর নজর রাখি। ধীরে ধীরে ওর বিশ্বাস অর্জনের জন্য খাবার দিতে থাকি। এই ভাবে প্রায় দিন দশেক দেওয়ার পর এক দিন ভিক্ষারিটারে ফ্ল্যাটে ডেকে আনি। আমার সমস্ত কিছু গোছান ছিল ফ্ল্যাটে। বাড়ি ডেকে এনে কি করবো, মাডার করার পর করবো সব। আর এতটা নিখুত ভাবে করে ছিলাম যে কোন ভুল হওয়ার কথাই ছিল না। কারণ একজন অপরাধিকর মস্তিষ্ক যত না তী² হয় তার থেকেও এক জন …………… এর মস্তিষ্ক অপরাধের ক্ষেত্রে অনেক অনেক বেশি তীব্র হয়।  যাই হোক, একদিন ভিক্ষারিটাকে ডেকে ফ্ল্যাটের ডায়নিং-এর সোফাই বসাই। তারপর খাওয়ার টেবিলে এত ভালো খাবার দেখে ভিক্ষারিটা পাগলের মত হয়ে যায়। খাবারের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আমি খাবারের মধ্যে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিই, যাতে খাবার খেয়ে নেতিয়ে পরে এবং আমি পিছন থেকে গলার নলিটা কেটে ইহজগতের ভবলীলা সঙ্গকরি। কিছুক্ষণের জন্য পাশের ঘরে আমি চলে যাই এবং সেখান থেকে লক্ষ্য রাখি। দেখি কিছু খাবার মুখে দিচ্ছে কিন্তু বেশির ভাগটাই ছেঁড়া জামা ও থলিটার মধ্যে ঢুকিয়ে নিচ্ছে। এই ভাবে করতে করতে আমার ………. এর আগেই ভিক্ষারিটা টেবিলে লুটিয়ে পরে, এবং একটা হাত তখন খাবার ঢোকাতে ছেঁড়া পুটলিটার ভিতর। আমি এসে ভিক্ষারিটাকে ভালো করে দেখে চিয়ারে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিই। তারপর পকেট থেকে ….. র একটা ছুরি বার করে গলার কাছে নিয়ে যাই এবং তখনই খুট করে একটা শব্দ হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার ডান হাতের তালু ভেদ করে কি যেন একটা বেড়িয়ে যায় তিব্র শব্দ করে। তৎক্ষণাত তিব্র যন্ত্রণায় ও চিৎকার করে আমি মেঝেতে বসে পরি।
তিব্র যন্ত্রণার মধ্যেও চোখ খুলে দেখি ভিক্ষারিটা উঠে দাড়িয়েছে এবং হাতে …… যার থেকে একটা গুলি একটু আগেই আমার ডান হাত ভেদ করে চলে গেছে। আমার বুঝতে বাকি থাকলো না যে খেলাটা আমি খেলেছিলাম আমিই মাষ্টার মাইন্ড ছিলাম সেটা আসলে …….. এর ….. রা খেল ছিল আমি একটা ক্যারেক্টার ছিলাম মাত্র। পড়ে জানতে পারি। প্রথম মাডার এর পর থেকেই পুলিশ আমাকে নজরে রেখে ছিল। আমাকে হাতে নাতে ধরবে বলে। এতদিন পর তারা সফল হয়েছে, প্রায় ২০ মাস পর আমি ধরা পরার পর, আমার সমস্ত গোপন তথ্য প্রকাশ পেয়ে যায় এবং আদালতের রায়ে আমার ১০ বছরের সশ্রম কারাদন্ডের আদেশ দেয় এবং আমার মেডিক্যাল লাইসেন্স ক্যানসেল করে দেয়।
এতক্ষণে দেবদুলাল বাবু একটা স্বস্থির নিশ্বাস ফেললেন। তারপর আবার পরতে শুরু করলেন। খবরের কাগজে বেশ ফলাও করে খবরটা বেরোয় ও সমলোচনার ঝড়ও উঠে। তারপর সব ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে যায়। প্রথম কয়েকটা বছর আমাকে মেন্টাল হাসপাতালে রাখার পর সংশোধনাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পড়াশোনায় ভালো ছিলাম বলে জেলের হিসাব নিকাশের কাজ করে দিতাম। ধীরে ধীরে আমার অ্যাকাউন্টের নলেজ ভালো হতে থাকে।
সংশোধনাগারের মধ্যেই একটি মেয়েকে ভালো লাগে এবং ভালোবাসাই পরে জেলেই আমাদের বিয়ে হয়। দেখতে দেখতে ১০ বছর কেটে যায়। প্রায় দুই জনেই একই সাথে জেল থেকে ছাড়া পাই। ততদিনে আমার মন থেকে পুরোনো সমস্ত স্মৃতি মুছে যায়।
জেলে থাকতে ভালো কাজের সুবাদে দুজনেরই একটা কাজ জুটে যায় এই শিশিরপুর প্রাইমারি স্কুলে। আমি স্কুলে অ্যাকাউন্ট দেখতাম এবং আমার বউ স্কুলে বাচ্চাদের রান্না করে দিত। এই ভাবে দিন ভালোই চলছিল। তারপর আমাদের ছেলে হলো, আমি শিশিরপুর হাসপাতালে অ্যাকাউন্ট ডিপাটমেন্টে একটি চাকরি পেলাম। মাইনে বাড়ালো। ভাড়া বাড়ি ছেড়ে নিজের বাড়ি বানালাম। দিন ভালো ভাবেই কেটে যাচ্ছিল। দেবদুলাল বাবু এবার আপনাকে একটা কাজ দিয়ে যাচ্ছি, আমি আশাকরি এর উপযুক্ত ব্যবস্থা আপনি নেবেন। চিঠির বাকি অংশটা পড়ে দেখুন সব বুঝতে পারবেন। কিন্তু কথায় বলেনা আমরা চাইলে অতীত ভুলতে পারি, কিন্তু অতীত আমাদের কখনোই ভোলেনা। আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৩-৪ বছর আগে হাসপাতালের এক ডাক্তার আমায় চিন্তে পারে। সে আমার অতীতে সব খবরই জানত। আমার সাথে কথা বলতে এলে আমি আমার অতীত পরিচয় গোপন করি। কিন্তু ঐ ডাক্তারটি আমার নির্ভুল ভাবে চিনতে পেরেছিল। তার প্রমান পেয়েছিলাম পরের দিন। হাসপাতালের সুপার সকালই আমাকে ডেকে পাঠান। আমি ওনার অফিস ঘরে ঢুকতেই, আমাকে সাদর আমন্ত্রণ করে ওনার সামনের চিয়ারে বসান আর বলেন, আমার কাজে উনি খুব খুশি। তাই আমার মাইনে প্রায় ৫ হাজার টাকা বারিয়ে দেয় । দুহাজার টাকা মাইনে বৃদ্ধি একজন সাধারণ অ্যাকাউন্টের কাছে অনেকটাই। আমি একটু অবাকই হই। বছরে মাঝখানে এই রকম হুট করে মাইনে বাড়ালো। আমি এটাই প্রশ্ন করি ওনাকে, তার উত্তরে উনি বলেছিলেন আমার কাজে সুখ্যাতি শুনে। আমি appraisal letter নিয়ে উঠে চলে আসছি তখন আমাকে পিছন থেকে ডাকলেন উনি, আর বল্লেন, আমার এই মাইনে বৃদ্ধির সুখবর-এর জন্য ওনাকে কিছু গিফ্ট দেবে না? আমি বলি কি নেবেন বলুন। তাতে উনি বলেন, আমায় রাতে একবার দেখা করতে তখন উনি চেয়ে নেবেন। আমি মাথা নেরে চলে যাই এবং মনে প্রচন্ড খুশিতে কাজ করতে থাকি। সন্ধে ৬টা বাজতেই সুপারে ঘরে যাই কিন্তু তিনি একটা মিটিং-এ ব্যস্ত থাকায় আমায় বসতে বলে। আমি ঘরের বাইরে বেঞ্চে এসে বসি। অনেকক্ষন পর হাত ঘড়ি দেখি প্রায় ১ ঘন্টা ১০ মিনিট হয়ে গেছে। প্রায় সাতটা ৪০ নাগাত মিটিং শেষ করে আমায় নিয়ে কোথায় যাবেন বলে বেরোলেন। প্রথম বিল্ডিং-এর পাশ দিয়ে পিছনের বিল্ডিং-এ পৌঁছালেন এবং আমাকে নিয়ে বিল্ডিং-এর পিছনের দিকের একটা ছোট দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। বেরোতেই আমি দেখি একটা টিনের সেড্ আর একটা আলো জ্বলছে কিন্তু তাতে অন্ধকার দূর হওয়ার পরিবর্তে যেন একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। পা বারালেই গিলে খাবে। এই প্রথম আমার ভয় করতে লাগলো। আমি প্রশ্ন করলাম আমায় কোথায় নিয়ে এলেন। তাতে উনি বললেন, ভয় পাচ্ছো নাকি! চলো আমার সাথে। কিছুক্ষন ধরেই একটা বটকা গন্ধ নাকে আসছিল। কিন্তু আরো এগোতেই এবং সামনের ঘরটা খুলে ভিতরে ঢুকতেই গন্ধের কারণ ও উৎপত্তি সবই বোধগম্য হল। হঠাৎ করে কে একজন দরজা বন্ধ করে আমার মুখে মাক্স বেধে দিল। আর তখনই পাশের অন্ধকার থেকে গুরুগম্ভির গলায় একটা পুরো নামে আমায় ডেকে উঠলো।
‘‘আসুন প্রদ্যুৎ বাবু অরফে কমলেশ সোম’’ আমি চমকে সেই দিকে তাকাই। ‘‘আপনি আমায় চিনবেন না, আর চেনার চেষ্টাও করবেন না।’’ ঘরটি আলো অন্ধকারে ঘেরা, তবে বুঝতে অসুবিধা হল না, ঘরে আমি আর সুপার বাবু ছাড়াও আরো চারজন আছে। এক ঐ রহস্যময় ব্যক্তি, দুই আমার অতীতের সহকর্মী অর্থাৎ গতকাল যে আমায় চিনতে পেরে ছিল। আমার বর্তমান সহকর্মী রাম বাবু আর একজন ওয়াড বয়। আবার ঐ রহস্যময় ব্যক্তি বলে উঠলেন, ‘‘কমলেশ বাবু আপনার অতীতে সমস্থ কথা তো আমরা জেনে ফেলেছি। আপনি কেন কলকাতায় ডাক্তারি ছেড়ে কলকাতা থেকে এত দূরে একটা সামান্য অ্যাকাউন্টের চাকরি করছো।’’ আমি ভয়ে ভয়ে বলি আমি তাতে কি করবো। তখন সুপার বাবু আমাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে বলতে শুরু করলো। ওনারা ৭ জন মিলে একটা শরীরে অঙ্গ প্রতঙ্গ পাচারের কাজ করে, যারা খুব গরিব, যার টাকার জন্য দাহ করতে পারছে না তাদের থেকে সব দেহ নিয়ে এসে দাহ করার নাম করে শরীর থেকে অঙ্গ প্রতঙ্গ বার করে নিয়ে বডিকে নদীর ধারে পুরিয়ে দিত। ধীরে ধীরে পাচারে মাত্রা বারলে মৃতদেহ থেকে হাসপাতালে মর্গের লাস এবং পরে খুন পর্যন্ত নেমে আসে। কিন্তু তাদের খুব ভালো anatomy ডাক্তারের প্রয়োজন ছিল। এক কথায় anatomy expert এর প্রয়োজন ছিল। যাতে শরীরে অঙ্গ প্রতঙ্গগুলি আরো ভালো করে অপারেশন করে বার করতে পারে। তাতে আরো বেশি পাচার ও প্রচুর টাকা। আর সেই সময়েই আমার সাথে তাদের দেখা। আমার অতীতে সমস্ত খবর বের করে দেখে আমার থেকে বড় anatomy expert ওরা আর পাবেনা। তাই আমাকে যেন তেন প্রকারে ওদের দলে ঢোকাতেই হবে। সব শুনে আমি ওদের দলে না যোগ দিতে চাওয়ায় প্রথমে আমার মাইনে যেখানে ৫ হাজার বারছিল সেখানে ১০ হাজার বেরে গেল তাতেও আমি রাজি হয়নি, তারপর আমার অ্যাকাউন্ট ম্যানেজারের পদ ও ১০ হাজার টাকা মাইনে বৃদ্ধি প্রস্তাবও দেওয়া হয়। তাতেও যখন আমি রাজি হয়নি তখন আমার ছেলে ও স্ত্রীকে খুন করে দেওয়ার হুমকি দেয় ও আমার অতীতের কথা সবাইকে বলে আমার ও আমার পরিবারের ক্ষতি করবে বলেও হুমকি দেয়। তারপর আমার হাতে কোন উপায় না থাকায় আবার সেই পুরোন পৈশাচিক নিশৃংস কাজে নামতে বাধ্য হই।
আমি ওদের কাজে সাহায্য করায় ওদের ব্যবসা আরো ফুলেফেপে উঠতে থাকে। বিশে করে রাতে দিকেই কাজ বেশি হয়। তাই বাড়িতে ফিরতেও প্রায়ই দেরী হয়ে যেত। আমি আমার স্ত্রীকে কিছু বলতে পারিনি এই ব্যাপারে। শুধু বলি আমাকে আমার কাজ দেখে হাসপাতালের অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার করে দেওয়া হয়েছে। তাই কাজের চাপের জন্য বাড়ি ফিরতে দেরি হবে। যে জঘন্য কাজের জন্য আমার জীবন থেকে প্রায় বছর ১০-১২ কেড়ে নিয়েছিল। প্রায় সেই কাজে আবার আমি যুক্ত হয়েছি সেটা শুনলে আমার স্ত্রী আমাকে আর ক্ষমা করতে পারবে না। আর আমার একমাত্র সন্তানের জীবনও শেষ হয়ে যাবে।
ওরা আমাকে অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার পদে নিযুক্ত করেছিল এবং মাইনেও বারিয়ে ছিল। কিন্তু আমি যাতে কারুর কাছে কিছু বলে না দিই বা পালিয়ে না যাই সেই কারণে প্রায় প্রতি সপ্তাহে ওদের মধ্যে কেউ না কেউ বাড়ি এসে আমার স্ত্রী ও সন্তান কে গিফ্ট  দিয়ে আমাকে মনে করিয়ে দিয়ে যেত যে একটা ভুল পদক্ষেপ মানে আমার স্ত্রী, পুত্রের জীবন শেষ।  শুধু তাই নয় ওদের এই জঘন্য বেআইনি ব্যবসার মুনাফা থেকে এক মোটা অংশ আমায় দিত, কিন্তু আমি কোনদিনও ঐ টাকায় একটা টাকাও খরচ করিনি। আপনি আমার ঘরের তৃতীয় সিন্দুকটা খুললে সব টাকা পেয়ে যাবেন। এত বছর পরেও আমি ঐ টাকা খরচ করিনি।
কিন্তু বর্তমানে এখানে যে হাইওয়ে হয়েছে তার জন্য অনেক বডি হাসপাতালে আসত। তাদের শরীর থেকে কিছু কিছু অঙ্গ কেটে বের করে নেওয়া হত পোস্টমর্টেম-এর নাম করে। তারপর আবার পরিবারে লোক কেউই টেরটিও পেতনা। আর বেওয়ারিশ বডি হলে তো কথাই নেই দুই থেকে তিন দিন মর্গ ফেলে রাখা হত কোন খবর নিতে কেউ যদি না আসতো পুরো বডি গুপ্ত লাস ঘরে পাচার হয়ে যেত। সেখানে আমারও আরো দুই জন ডাক্তারের তত্বাবোধনে একটা বডি প্রতিটা অংশ টুকরো টুকরো করে আলাদা আলাদা প্যাকিং করে চলে যেত দূর দূরান্তে। আপনি শুনলে অবাক হবেন, মাথার চুল, পায়ে হারে নোখ, গায়ের চামড়া সব পাচার হয়, এমনকি শরীরে মাংস পর্যন্ত। যদি তারপরেও কিছু অবশিষ্ট থাকত তাহলে লাস ঘরে পিছনের মাঠে পুতে দেওয়া হত। আমি অনেক বার সরে আসার চেষ্টা করি কিন্তু পারিনা। এত বছর ধরে এত বড় পাচার চক্র চালাচ্ছে সে আমি ভাবতেও পারিনা। এত বছর পুলিশ এদের কোন খবরই পাইনি। এরা মানুষ নয় মানুষ রূপী নরখাদক পিশাচ। বিশেষ করে রাম বাবু, হাসপাতালের সুপর ও ওদের মাথা। আমি এখন পর্যন্ত ওনার গলাই শুনেছি চোখে দেখা হয়নি। সাক্ষাৎ পিশাচকে কেমন দেখতে হয় তা দেখবার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু এটাও জানি শুধু ওরা নয় আমিও একই অপরাধ করেছি।
এই আগের সপ্তাহের ঘটনা আমার ছেলে রহিত এর চোখে পরে কয়েকটা ঘটনা। ও আমার জন্য প্রায়ই খাবার নিয়ে যেত হাসপাতালে। ওয়ার্ড বয় স্টেচারে করে মৃত দেহ নিয়ে বিল্ডিং এর পিছনে চলে যায়। আবার খালি স্টেচার নিয়ে ফিরতে আসে এই সব। আমাকে প্রশ্নও করে, কিন্তু আমিও জানিনা বলে উড়িয়ে দিই। কিন্তু পরে বুঝিয়ে বলি ওটা সাধারণ ঘটনা পোষ্টমর্টেম ওখানে বডি রাখা হয়, তাই। রহিত বুঝলেও আমার মনের মধ্যে বিশাল একটা ঝড় উঠতে শুরু করে। শরীর মন তোলপার করতে থাকে। সেই দিন রাতে এবং তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিন রাতেই আমি স্বপ্নে দেখি রহিত কাউকে কিছু না বলে পিছনের দরজা দিয়ে লাস ঘরের দিকে যায় সমস্ত গোপন জিনিস ওর সামনে উনমুক্ত হয়ে যায়। কেন হাসপাতালের পিছনের দিকে যাওয়া বারন সবার, কেন এত সিকিউরিটি কুকুর পাহারা, মৃত দেহ গুলো নিয়ে কি করা হয়। সব, সব কিছু ওর বাবার ভালো মানুষটার পিছনে যে জঘন্য পিশাচটা লুকিয়ে আছে তার পরিচয় সবকিছু। গত পরশু লাস ঘর থেকে রাতে ফেরার পর স্বপ্নের শেষ পরিণতিটা দেখে আমার মনে হয়েছে আমার কাছে আর একটা মাত্র পথই খোলা আছে। সেই দিন রাতে স্বপ্নে দেখ সব কিছু দেখে রহিত প্রাণপন দূরে সবার চোখের আরালে নদীতে গিয়ে ঝাপ দেয় ও সব গায়ে গন্ধ ও জামা কাপড় ফেলে দিয়ে নদী থেকে উঠে আসে এবং সামনে পরে রাম বাবু ও ভয়ঙ্কর হংস্র চারটি কুকুরের। পলক ফেরার পূর্বেই কুকুরগুলো রহিতের উপর ঝাপিয়ে পরে এবং কিছুক্ষণের মধ্যে আমার সুন্দর ছেলেটাকে ক্ষতবিক্ষত করে কামড়ে গলার টুটি ছিড়ে মেরে ফেলে। আর আমার স্বপ্ন ভেঙে যায়। তখনই আমি আমার জীবনের সব থেকে বড় সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলি। আমি নিজেকে শেষ করে দেব। তাতে পিশাচগুলোর ব্যবসাতে বিশাল বড় ক্ষতি হবে এবং পুলিশকে সব কথা বলে দিলে পুলিশ ওদের ধরে ওদের দলের সবাইকে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারবে। পুলিশ ও আইন ব্যবস্থার উপর আমার পূণ্য আস্থা আছে। আমার পরিবার এবং তার সাথে অসংখ্য পরিবারের রক্ষোর দায়িত্ব এখন আপনার এবং আপনাদের ডিপাটমেন্টের। আমার অতীতের সব কাগজ পত্র ঐ তৃতীয় সিন্দুকের মধ্যেই পাবেন আর পাবেন প্রায় ৫০ লক্ষ টাকারও বেশি টাকা।
আর হ্যাঁ গত সপ্তাহে যে মিনতী বলে মেয়েটা নিখোঁজ হয়েছিল তাঁকেও এই পিশাচ গুলো ভুলিয়ে ভালিয়ে ওকে খুন করে আমার হাত দিয়েই ওর শরীর টুকরো টুকরো করে কাটায়।
তাই আমি কমলেস সোম ওরফে প্রদ্যুৎ সোম নিজের সজ্ঞানে আমার এই পাপি হাতটা নিজের হাতে কেটে আজ রাতে আমি আমার জীবন শেষ করে দেব।
ইতি –
প্রদ্যুৎ সোম।

Audio Story Starts From Here:

Story InfoName
WriterDebanshu Ghosh
Intro & EndingPriyanka Dutta
CharactersName
KathakAkash Debnath, Debanshu Ghosh
Ram BabuSurojit Mukherjee
Prodyut BabuSouradip Roy

Find us on Facebook – click here

আরো পড়ুন

What’s your Reaction?
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0

About Post Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *