Views: 6

প্রতিশোধ:

পুজো শেষ হল কদিন আগে। এখনও ছেলের পুজোর ছুটি আছে। তাই সাধন বাবু ভাবলেন একবার শিমুলতলা থেকে ঘুরে আসবেন। স্ত্রী কে বললেন,

-“গিন্নী, একবার শিমুলতলা ঘুরে আসি চলো। খোকার স্কুল তো ছুটি আছে এখন। বেড়িয়ে আসা যাবে। পঙ্কজ কাকা ওখানে সব কিছু একা একা সামলান। কত বার বলেছি যে চলে এসো আমাদের এখানে, উনি কোনো কথা শোনেন না। খালি একটা কথাই বলেন,’ তোমার বাবা এত সাধ করে বাড়িটা বানিয়েছেন। এখন তিনি বেঁচে নেই বলে তো বাড়িটা অবহেলায় নষ্ট হতে দিতে পারি না।”

সাধন বাবুর স্ত্রী সুধা দেবী হেসে বললেন,

-” পঙ্কজ কাকা পুরোনো দিনের মানুষ। বাবা কে খুব ভালোবাসতেন। তাই ওই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে চান না। তুমি ওনাকে জানিয়ে দাও আমরা দিন সাতেক ওখানে গিয়ে থাকবো। তাতে ওনার ও ভালো লাগবে। উনি খোকা কে খুব ভালবাসেন কিনা।”

সাধন বাবু তাদের যাবার খবর চিঠি লিখে জানিয়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়লেন দুদিন পর। সারারাত ট্রেনে ভালো ঘুম হয় নি। তারপর কিছু মানুষের অতিরিক্ত কোলাহলে প্রাণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। স্টেশনে নেমে তিনি লালু সিং কে খুঁজতে লাগলেন। উনি বলে দিয়েছিলেন কোন ট্রেনে আসবেন। লালু সিং ওনাদের দেখতে পেয়ে দৌড়ে এলো। ব্যাগ গুলো নিজে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বললো,

-” হামি সব ঠিক করে রিখে এসেছি। বাইরে টাঙ্গা দাঁড়িয়ে আছে। আপনি আসেন সাব।”

ওরা সবাই টাঙ্গায় চড়ে বসলো। সাধন বাবুর ছেলে সৃজনের খুব আনন্দ হচ্ছে। কতদিন পর সে আবার ঘোড়ার গাড়ি তে উঠেছে। এখন আবহাওয়াটা বেশ মনোরম। ওত বেশি গরমটা নেই। আগে এই অঞ্চলে এত গাড়ি ঘোড়া ছিল না। কলকাতা বা আশপাশের মানুষ হাওয়া বদলের জন্য এখানে আসতো। তার মধ্যে যাদের একটু পয়সাকড়ি ছিল তারা একটা করে বাড়ি কিনে বা বানিয়ে রেখেছেন। সাধন বাবুর বাবা সারাজীবন জমিদারি থেকে বিস্তর টাকা উপার্জন করেছেন। শেষ বয়সে শিমুলতলায় এই বাড়ি তৈরি করে এখানেই কাটিয়েছেন। এখন আস্তে আস্তে দোকানপাট বেড়েছে। লোকজনও বেড়েছে অনেক। তবুও এখানের জল হাওয়া তে যেন একটা জাদু আছে। এখানে এলেই শরীর ও মন দুটোই চাঙ্গা হয়ে যায়। চারদিক দেখতে দেখতে ওরা মিনিট কুড়ির মধ্যে বাড়ি পৌঁছে গেলো।গেটে কেউ নেই। সাধন বাবু অবাক হলেন। প্রতিবার পঙ্কজ কাকা ওনাদের জন্য দাঁড়িয়ে থাকেন। সাধন বাবু কে দেখলেই উনি খুশি তে কি করবেন বুঝে উঠতে পারেন না। সাধন বাবু লালু সিং কে জিজ্ঞেস করলেন,

-” এই লালু সিং, ম্যানেজার বাবু কিধর হায় রে? গেট পে খড়া নেহি হায় ইস বার?”

লালু সিং একটু জোর করে হেসে বললো,

-” বো ম্যানেজার বাবু কাল সাম কো দেওঘর চল গ্যায়া। আমাকে বলে দিয়ে গেছে সব। আপনাদের কুছু তকলিফ হবে না সাব।”

সাধন বাবু মনে মনে বললেন,

-” কাকা দেওঘর চলে গেলো কিন্তু আমাকে একবার জানালেন না। আমাকে তো বলতে পারত দুদিন পরে আসতে। কি জানি কিছুই তো বুঝতে পারছি না।” 

গাড়ি থেকে নেমে ওরা ভিতরে গেলো।লালু সিং এর বউ পার্বতী এই বাড়ির সব কাজ করে। সে তখন রান্নাঘরে রান্না করছিলো। লালু সিং ব্যাগ গুলো উঠোনে রেখে দৌড়ে গিয়ে বললো,

-“এ পার্বতী দিখ কলকাতা থেকে সাব এসেছে উনার পুরা পরিবার লেকে। তু ওদের জন্য খাবারের ইনতেজাম কর। আমি উনাদের ঘরে ব্যাগ গুলো রেখে দি আসি।”

পার্বতী কোনো উৎসাহ দেখালো না। সে চুপচাপ যেমন রান্না করছিলো তেমন করতে লাগলো। পার্বতীর মন টা তেমন ভালো নেই। লালু ওই শয়তান তুহিনের পাল্লায় পড়ে দিন দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। প্রায় অশান্তি করে। আর কিসের যেন একটা আলোচনা করে। পার্বতী আর লালুর একটা মেয়ে আছে। নাম ঝিলমিল। বয়স ওই বারো। ভারী মিষ্টি মেয়ে, একটু দুরন্ত বটে। পার্বতীর জগৎ বলতে ওর মেয়ে। সে এখন ওর দাদাজির কাছে বেড়াতে গেছে। লালু দিয়ে এসেছে কাল। মেয়ে বাড়িতে নেই তাই ওর মন টা ভালো নেই।পার্বতী একবার দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে আবার কাজে মন দিলো। সৃজন বাড়িতে ঢুকেই ছোটাছুটি শুরু করে দিয়েছে। তাই সুধা দেবী বিরক্ত হয়ে বললেন,

-“খোকন তুই কিন্তু এবার দুষ্টুমি করছিস। এখনই কোথাও পড়ে যাবি আর হাত পা ভাঙবে। চল জামাকাপড় বদলে, মুখ হাত ধুয়ে নিবি ভালো করে। সারা রাস্তা ধুলো তারপর ট্রেনের ওই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। চল চল এখনই চল।”

সুধা দেবী একবার পার্বতীর সাথে রান্নার ব্যাপারে দু একটা কথা বলে সৃজন কে নিয়ে ওপরে ঘরে চলে গেলেন। সাধন বাবু লালু সিং কে জিজ্ঞেস করলেন,

-” বাগানের গাছ গুলো ঠিক আছে? এবারে অনেক ফল হয়েছিলো শুনলাম। বাজারে বিক্রি করে কত লাভ হল এই বছর?”

লালু সিং বললো,

-“ওসব হামি বলতে পারব না সাব। ওসব তুহিন বাবু দিখাশোনা করেন। আপনি ওনাকে জিজ্ঞেস করবেন।”

সাধন বাবু অবাক হলেন। মনে মনে ভাবলেন,

-“তুহিন মানে তো পঙ্কজ কাকার ছেলে। ছেলেটা ভালো নয় শুনেছি। তার জন্য পঙ্কজ কাকা কত দুঃখ করতেন। সেই ছেলে হঠাৎ বাবার সাথে হাত মিলিয়ে কাজ করছে। ভারী আশ্চর্য তো!!ব্যাপারটা দেখতে হচ্ছে।”

সাধন বাবু জিজ্ঞেস করলেন,

-” তা তুহিন কে কোথায় পাবো?”

লালু সিং বললো,

-” উনি একটু পরেই বাড়িতে আসবেন দুপুরের খাবার খেতে। তখন আপনি জিজ্ঞেস করবেন সাব। এখন আপনি ওপরে গিয়ে বিশ্রাম করেন। আমি খাবার তৈরী হলেই আপনাদের খবর দেবো।”

সাধন বাবু এদিক ওদিক দেখে জিজ্ঞেস করলেন,

-” লালু,তোমার মেয়ে ঝিলমিল কে দেখছি না তো। ও কোথায়? শরীর খারাপ নাকি ওর? অন্যবার তো দেখি উঠোনে খেলা করে। পার্বতীর সাথে থাকে সবসময়।”

লালু সিং বললো,

-” ও সাব ওর দাদাজির কাছে ঘুমনে গেছে। চলে আসবে দু- তিন দিনের মধ্যে।”

সাধন বাবু আর কোনো কথা না বলে ওপরে চলে গেলেন। দুপুরে খাওয়ার সময়ে তুহিনের সাথে দেখা হলো সাধন বাবুর। তাকে দেখেই সাধন বাবুর খাওয়া থেমে গেলো। ছেলে টার গায়ে একটা নীল রঙের পাঞ্জাবি আর কালো প্যান্ট। চোখে অদ্ভূত একটা রোদ চশমা আর গলায় একটা রুমাল বাঁধা। কানে দুল আর হাতে মোটা সোনার চেন। পাড়ার মাস্তান বা গুন্ডা গুলো ঠিক এইরকম ভাবে ঘুরে বেড়ায়। সে খেতে বসে হেসে বললো,

-“আরে সাধন দা, ভালো আছেন তো? কতদিন পর আপনাকে দেখলাম। আপনি চিন্তা করবেন না। আপনার কোনো অসুবিধা হবে না। খান খান ভালো করে খান। এ লালু সিং, দাদার ভালো করে খেয়াল রাখবি। বাবা যাতে এসে আমার ওপর চোটপাট না করতে পারে।”

সাধন বাবু আবার খাওয়া শুরু করে বললেন,

-” পঙ্কজ কাকার হঠাৎ দেওঘর যাবার দরকার পড়লো কেন? তুমি কি কিছু জানো?”

তুহিন হেসে বললো,

-” আর বলবেন না দাদা। আপনি তো জানেন আমার বাবা একটু বেশি ঠাকুর ভক্ত। তারপর ওই দেওঘরে কে একজন ঠাকুর আছেন বাবা গত মাসে তার থেকে দীক্ষা নিয়েছেন। বাবার নাকি জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে।তার সাথে দেখা করবে বলে কাল বিকালে চলে গেলেন। আমাকে বলে গেছেন আপনাদের ভালো করে যত্ন করতে।”

সাধন বাবু আর কিছু বললেন না। চুপচাপ খেয়ে উঠে পড়লেন। খাওয়া শেষ করে ওপরে আসার জন্য সিঁড়ি দিয়ে উঠতে যাবেন এমন সময়ে পার্বতী হঠাৎ পেছন থেকে ডাকল,

-” সাব।”

সাধন বাবু ঘুরে দাঁড়ালেন। পার্বতী চারদিকে ভালো করে দেখে নিলো। রান্নাঘরের পাশের ঘরে খাবার ঘর। সেখানে তুহিন আর লালু এখনো হাসাহাসি করছে আর খাবার খাচ্ছে। সুধা দেবী ছেলে সৃজন কে নিয়ে আগেই খেয়ে ওপরে চলে গেছেন। সাধন বাবু বললেন,

-” তুমি কি কিছু বলবে পার্বতী?”

পার্বতী শুধু ঘাড় নাড়লো। তারপর কাছে সরে এসে ফিসফিস করে বললো,

-“সাব, বো তুহিন সাব ভালো লোক না আছে। এবারে সব ফল বিক্রির টাকা ও একাই সরিয়েছে। ম্যানেজার বাবু কে হুমকি দিয়ে চুপ করিয়ে রেখেছিলো। কাল বিকালে ওনার সাথে তুহিন বাবুর অনেক ঝামেলা হয় তারপর থেকে ম্যানেজার বাবু আর কথা বলেন নি আমাদের সাথে। উনি তারপর কোথায় একটা চলে গেলেন।”

তুহিন কে ঘর থেকে বেরোতে দেখে তিনি বললেন,

-” তুহিন, তোমার সাথে আমার একটু কথা আছে। বসার ঘরে এসো।”

পার্বতী তুহিন কে বেরোতে দেখে নিজের ঘরে চলে গেলো। বসার ঘরে তুহিন ঢুকতেই সাধন বাবু বলে উঠলেন,

-“তুহিন, তখন তোমায় আমি একটা কথা জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিলাম। লালু বললো তুমি নাকি বাগানের সব ফল বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া গেছে তার হিসাব রেখেছ। আমাকে একটু দেখিও।”

তুহিন ঘাবড়ে গেলো প্রথমে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,

-” ওসব তো আমার কাছে নেই। বাবা তো দেওঘর যাবার আগে ওইসব আলমারি তে রেখে গেছে। আপনি বাবা কে জিজ্ঞেস করে নেবেন।”

সাধন বাবু একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তে তাকালেন তারপর বললেন,

-” বটে। ঠিক আছে। কাকা আসুন তারপর না হয় হিসেব দেখব। তা বলছি তত দিন লাভের টাকা থেকে কিছু নয় ছয় হবে না বলছ?”

সাধন বাবুর এই রসিকতা তুহিন বুঝতে পারলো। সে আর কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। লালু সিং দাঁড়িয়ে আছে মোড়ের মাথায়। সাথে ঝিলমিল। সে বাবা কে প্রশ্ন করছে,

-“বাপু আমরা এখানে কি করছি? তু আমাকে দাদাজির বাড়ি থেকে নিয়ে এলি কেন?”

লালু সিং একটু বিরক্ত হলো। রেগে বললো,

-” তু এত প্রশ্ন করছিস কিসের জন্য। চুপ করে দাঁড়াতে পারছিস না। তোকে একটা কাজে নিয়ে যাচ্ছি। তু তো জানিস ঝিলমিল আমি পড়া লেখা জানি না। তাই তু আমাকে একটু সাহায্য করে দিস।এখন আর মাথা খারাপ করিস না আমার।”

তারপর বাইকে চেপে দুটো ছেলে এলো। বেশ পেটানো চেহারা। তাদের মধ্যে একজন জিজ্ঞেস করলো,

-” তুমি কি লালু?”

লালু মাথা নেড়ে উত্তর দিলো,

-” হ্যাঁ।”

লোকটা বললো,

-” ঠিক আছে। কাজটা কিন্তু খুব গোপনে হবে। তোমার গুড়িয়া কোনো ঝামেলা করবে না তো? শুনো লালু সিং কাজ যদি ভণ্ডুল হয় তাহলে তুমি শেষ। কথা টা মনে রাখবে। এখন চলো জলদি।স্যার অপেক্ষা করছে।”

তারপর ওরা গাড়ির ধুলো উড়িয়ে হাওয়াতে মিলিয়ে গেলো।

সেদিন রাতে খাওয়া দাওয়া করে সাধন বাবু ছাদে পায়চারি করছিলেন। একটা কিছুর শব্দ পেয়ে তিনি পাঁচিল দিয়ে নিচের দিকে উকি মারলেন। লালু সিং তার বউ পার্বতীর সাথে ঝগড়া করছে। সাধন বাবু পাত্তা দিলেন না। কিছুক্ষন পর নীচে নামতে যাবেন এমন সময়ে খেয়াল করলেন বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে কি একটা বস্তার মত নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ওই তুহিন আর ওর দলের কিছু ছেলে নিয়ে যাচ্ছে। সাধন বাবু চেঁচিয়ে উঠলেন,

-” এই তুহিন, তুমি বস্তা করে কি নিয়ে যাচ্ছ?”

তুহিন একটু ঘাবড়ে গেলো প্রথমে তারপর চেঁচিয়ে বললো,

-” ও কিছু নয় সাধন দা। আপনার বাড়ির একটা ঘর গুদাম করা আছে। ওখান থেকে এক বস্তা চাল নিয়ে যাচ্ছি। আজকাল যা লোকের অবস্থা। সব তো আমাদের কেই করতে হচ্ছে জনগণের জন্য। কাল একটু চাল ডাল বিতরণ করব সামনের বস্তি তে। আসছি দাদা।”

ওরা চলে গেলো।সাধন বাবু আর কোনো কথা বললেন না। ঘুমোতে চলে এলেন নিজের ঘরে। অনেক রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলো সাধন বাবুর। সুধা দেবী ঠেলা মারতে লাগলেন।

-” কি গো জলদি ওঠো। দক্ষিণ দিক থেকে কিরকম আওয়াজ আসছে।”

সাধন বাবু ধড়মড় করে উঠে বসলেন বিছানায়। উনি ও ভালো করে শুনতে পেলেন। কেউ একজন খুব করুন গলায় বলছে,

-” আমাকে ছেড়ে দাও। আমি কথা দিচ্ছি এরকম কাজ আমি আর করব না। আমি আর বাজে কাজে সঙ্গ দেবো না।”

সাধন বাবু বললেন,

-” আরে এটা তো তুহিনের গলা। কিন্তু ও এরকম করে কথা বলছে কেন? ওকে কি কেউ মারার চেষ্টা করছে? চলো তো গিয়ে দেখি একবার।”

ওরা দক্ষিণ দিকে গিয়ে তুহিনের ঘরের সামনে দাঁড়ালো। সৃজন তখন ঘরে ঘুমিয়ে আছে। সারাদিন ছোটাছুটি করে সে বড়ই ক্লান্ত। তাই বড়দের ব্যাপারে তার কোনো মাথা ব্যথা নেই। তুহিনের ঘর থেকে তখনও একইরকম কথা ভেসে আসছে। জানলাটা খোলা ছিল ঘরের। সাধন বাবু জানলা দিয়ে একবার উকি মারলেন। কিন্তু এ কি! তুহিন ছাড়া তো ঘরে কেউ নেই। তারপর তিনি লক্ষ্য করলেন যে একটা ছুরি হাওয়া তে ভাসছে আর বারবার তাকে উদ্দেশ্য করেই নেমে আসছে তার দিকে। সেই ছুরির আক্রমণ থেকে বাঁচতে তুহিন বিছানায় পাগলের মত গড়াগড়ি খাচ্ছে আর কেঁদে কেঁদে বলছে,

-” আমাকে ছেড়ে দাও। আমি আর কখনও এরকম করব না। বাঁচাও আমাকে কেউ। বাঁচাও।”

সাধন বাবু বুঝতে পারলেন কিছু একটা গণ্ডগোল ঘটেছে বাড়িতে। তিনি এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ঘরে ঢুকে পড়লেন। সুধা দেবী পিছন পিছন ঢুকলেন। উনি এই দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে একবার আঁতকে উঠলেন তারপর সাধন বাবুর পিছনে দাঁড়িয়ে রইলেন। তুহিন তখন দৌড়ে এসে সাধন বাবুর পা ধরে বলতে লাগল,

-” দাদা আমাকে বাঁচান। ও আমাকে মেরে ফেলবে। আমি মরতে চাই না। আমি আর কোনদিন কারোর কোনো ক্ষতি করব না। দয়া করে আমাকে বাঁচান।”

সাধন বাবু পা ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলতে লাগলেন,

-” আরে কি করছো টা কি? কি এমন করেছো তুমি যে এরকম করছো?”

তুহিন উত্তর দিতে পারলো না। ভয়ে তার চোখ মুখ অন্যরকম হয়ে গেছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সাধন বাবু যেন হাওয়ার সাথে কথা বলতে শুরু করলেন,

-” কে তুমি? কি চাও? ওকে এরকম ভাবে ভয় দেখাচ্ছ কেন?”

এত চিৎকার শুনে লালু সিং ও তার বউ ওপরে চলে এসেছিল। লালু জিজ্ঞেস করলো,

-” কা হুয়া সাব?”

সাধন বাবু বললেন,

-” কি জানি? কিছুই তো বুঝতে পারছি না। তুহিন হঠাৎ চিৎকার করছিলো। তাই তো ছুটে এলাম।”

ছুরি টা তখনও তুহিনের দিকেই উদ্দেশ্য করে স্থির হয়ে আছে। আর তার কোনা দিয়ে টপ টপ করে রক্ত পড়ছে।তারা এরকম দৃশ্য দেখে অবাক। পার্বতী ভয় পেয়ে

-“ও রাম জি”

বলে প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার জোগাড়। তখন হঠাৎ একটা বাচ্চার কান্না শোনা গেলো। সে কেঁদে কেঁদে বলছে,

-” মাই আমাকে বাঁচাও। এই লোক টা আমাকে মেরে ফেলবে। আমাকে বাঁচাও।”

গলা টা শুনে সাধন বাবু অবাক হলেন। এটা তো ওনার খুব চেনা গলা।

-“এটা তো ঝিলমিলের গলা”

চেঁচিয়ে উঠলেন সাধন বাবু। তারপর বসে পড়লেন চেয়ারে। সুধা দেবী আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলেন,

-” হ্যাঁ গো তবে কি ঝিলমিল…”

সাধন বাবু চোখের ইশারায় থামিয়ে দিলেন সুধা দেবী কে।পার্বতী কিছু একটা আশঙ্কা করে জোরে জোরে ডাকতে লাগলো,

-” ঝিলমিল তুই কুথায় আছিস? আমি তোকে দেখতে পাচ্ছি না কেনো? সামনে আ। তেরি মাই তোকে ডাকছে। আ মেরে পাশ আ।”

তবু কাউকে দেখা গেলো না। ছুরি টা পড়ে গেলো মেঝেতে। কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। পার্বতী বুঝতে পারলো সবটা। তুহিন তার মেয়ের সাথে কিছু একটা করেছে। তাই সে প্রতিশোধ নিতে ভয় দেখাচ্ছে ওকে।লালুর মুখের দিকে তাকিয়ে পার্বতী ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর ওপর। পাগলের মত বলতে থাকে,

-” বল আমার মেয়ে কোথায়? ওকে কেনো দেখতে পাচ্ছি না আমি? সেদিন তু উকে আমার পিতাজির বাড়ি নিয়ে যাস নি তাহলে?”

লালু সিং নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বললো,

-” আমি ঝিলমিল কে বেচে দিয়েছি। শহরের একজন বাবু এসেছিল। ভালো দাম দেবে বলেছিলো। তুই তো জানিস আমাদের অভাবের সংসার। টাকার খুব দরকার। তাই তুহিন বাবু আমাকে এই প্রস্তাব টা দিলেন। আমি আর না করিনি। তোকে জানালে তুই কভি রাজি হতিস না তাই তোকে আমি বলি নি।”

পার্বতীর চোখ গুলো আগুনের মতো জ্বলে উঠলো। সে দু হাতে লালুর গলা টিপে ধরে রাগে বলতে লাগলো,

-” শয়তান তোর এত লোভ যে তুই আমাদের ওইটুকু একটা মেয়ে কে বেচে দিলি। তু কিরকম বাপ? তোর লজ্জা করলো না?”

সাধন বাবু দৌড়ে গিয়ে লালু কে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। ওদিকে সেই সুযোগে তুহিন পালাতে যাচ্ছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তে পঙ্কজ কাকা এসে তুহিন কে আটকে দিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন তার ছেলে আবার কোনো বড় সর্বনাশ ঘটিয়েছে। তিনি গম্ভীর মুখে বললেন,

-” তুই কোথায় যাচ্ছিস? চুপ করে এখানেই বসবি। চল ভিতরে চল।”

লালু বলতে লাগলো,

-“তুই আমার কথাটা বোঝ। মাইয়া থাকলে অনেক জ্বালা। তারে বিয়া দিতে হবে। একটু বড় হলেই ওই লড়কা গুলো ওকে পরেশান করবে। তার থেকে ওকে বেচে দিয়ে যে টাকা পেয়েছি তাতে আমাদের নতুন করে সব হবে। আমরা আবার বাচ্চা নেবো। তোর কোলে একটা বেটা আসবে। সে আমাদের অনেক কাম করে দিবে।”

কথা গুলো শুনছিলেন সাধন বাবু হাঁ করে। অশিক্ষা মানুষ কে এরকম পিশাচ করে দেয়। সুধা দেবী ও চুপ করে থাকতে পারলেন না। তিনি সাধন বাবু কে বললেন,

-” ওই শয়তান টা কে জিজ্ঞেস করো ও কি করেছে ওই ফুলের মত মিষ্টি মেয়েটার সাথে ?”

সাধন বাবু ধমক দিয়ে বললেন,

-” এই তুহিন, এখন বল মেয়েটার সাথে কি করেছিস?”

তুহিন ভয় পেয়ে আমতা আমতা করে বললো,

-” লালু সিং টাকা নিয়ে চলে আসার পর ওই মেয়েটা বড্ড জেদ করছিলো। কিছুতেই যেতে চাইছিল না। জোরে জোরে চিৎকার করছিলো। শহরের বাবু রেগে গিয়ে আমাদের অপমান করে চলে গেলো আর আমাকে হুমকি দিয়ে গেলো তিন দিনের মধ্যে টাকা ফেরৎ দিতে। তাছাড়া ওই মেয়েটা আমার দলের দুটো ছেলে কে কামড়ে দিয়েছে আরো নানা ভাবে আমাদের কাজ নষ্ট করেছে। আমার মাথা গরম হয়ে গেলো। মাথা গরম করে আমি ওকে খুন করে ফেলেছি।”

পার্বতী চেঁচিয়ে ওঠে,

-“মেরা ঝিলমিল। হায় মারা রামজি তুমি আমার মেয়ে কে আমার থেকে কেড়ে নিলে।”

সন্তান হারানো মায়ের কান্না শুনে সুধা দেবী যেনো সৃজন কে মনে মনে কল্পনা করে নিলেন। তারপর পার্বতী কে তিনি জোর করে ওখান থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেলেন নিজের ঘরে। পঙ্কজ কাকা নিজের ছেলের কীর্তি শুনে স্তম্ভিত হয়ে বসে পড়লেন বিছানায়। দু হাত মুখে চাপা দিয়ে গোপনে কাঁদতে লাগলেন।

পুলিশ কে সাধন বাবু ফোন করেছিলেন। পঙ্কজ কাকা বসে আছেন বসার ঘরের সোফায়। নিজের ভাগ্য কে দোষ দিতে দিতে বলতে লাগলেন,

-” তুই শেষে মানুষ খুন করতেও পিছপা হলি না। তোর মত সন্তানের বাবা ভাবতেই নিজেকে লজ্জা লাগছে আমার।”

লালু সিং একপাশে দাঁড়িয়ে আছে গুম হয়ে। তার হাত দিয়ে একটা পাপ হয়েছে। নিজের মেয়ে কে সে পরোক্ষ ভাবে খুন করেছে। চোখে জল চলে এলো লালুর। সাধন বাবু বললেন,

-” এইবার বুঝলাম ওইসব চালের বস্তা সব মিথ্যা। মেয়ে টাকে খুন করে তার মৃতদেহ টা ওর মধ্যে রাখা ছিল বাকি বস্তা গুলোর সাথে। বেশিদিন রাখলে দুর্গন্ধ ছাড়তে পারে এই ভেবে ওটাকে আজকে সরানো হচ্ছিলো। আমার অনুমান যদি ঠিক হয় তাহলে ওরা ওটাকে বাইরে নিয়ে গিয়ে কোনো আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। পুলিশ তদন্ত করলে সব জানা যাবে।”

তুহিনের এইসব কথায় কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে তখনও আতঙ্কিত। তার মুখ ফ্যাকাশে। সেই শয়তানি মাখা চোখ দুটো এখন আতঙ্কে ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। সে লুকিয়ে বসে আছে সোফার আড়ালে।সে শুধু ছুরি টা কোথাও আছে কিনা লক্ষ্য করছে। সাধন বাবু সবশেষে লালু কে একটা কথা বললেন,

-” শোনো লালু সিং ছেলে হোক বা মেয়ে দুটোই কিন্তু ঈশ্বর আমাদের উপহার দিয়েছেন। মেয়েদের নিয়ে যে ভুল ধারণা তোমার মনে রয়েছে সেটা মন থেকে মুছে দাও। মা বাবার দায়িত্ব সন্তান কে বড় করে তোলা স্নেহ দিয়ে। ছেলে মানেই সে কাজের আর মেয়ে মানে বোঝা এটা কোনোদিন ভেবো না আর।তুমিও কিন্তু সমান দোষী। এখন আর চোখের জল ফেলে কি করবে?যাও তুমি পার্বতীর কাছে যাও।”

লালু সিং কিছু বলতে পারল না। সে উপলব্ধি করেছে যে কত বড় ভুল সে করেছে। সে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলো সেখান থেকে।

খানিক পরে চোখের নিমেষে একটা ঘটনা ঘটে গেলো। পঙ্কজ কাকা আর সাধন বাবু দুজনে অপেক্ষা করছিলেন পুলিশ আসার। তুহিন তখনও একইভাবে বসে আছে।হঠাৎ একটা ঝড় উঠলো বাইরে। সাধন বাবু তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করতে গেলেন। ঠিক সেই সময়ে আবার সেই ছুরি টা দেখা গেলো। ঘরের আলো গুলো একবার জ্বলতে ও নিভতে লাগলো। ঘরের জিনিসপত্র এদিক ওদিক পড়তে লাগলো মেঝেতে। তুহিন আবার চিৎকার করে উঠলো,

-” বাবা! বাবা! আমাকে বাঁচাও। আমাকে মেরে ফেলবে ও।”

সাধন বাবু পিছন ফিরে দেখলেন কিন্তু তার বলার মত কিছু রইলো না। পঙ্কজ কাকা ও তখন হকচকিয়ে গেছেন। তারা কেউই এরকম পরিস্থিতির কথা কল্পনা করেন নি। 

ঠিক এক সেকেন্ডের মধ্যে সেই ছুরিটা সোজা এসে বিঁধল তুহিনের বুকে। তুহিন একবার জোরে,

-” বাবা!”

বলে চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। লালু আর সুধা দেবী ছুটে এসেছে এই ঘরে। তারপর তারাও দেখলো ছুরিটা যেন কোথায় মিলিয়ে গেলো আর তার সাথে শোনা গেলো একটা মেয়ের কান ফাটানো প্রচণ্ড হাসির শব্দ।

পুলিশ এলো তার খানিক পরে। তারা সব ঘটনা শুনে তুহিনের মৃতদেহ আর বাড়ির প্রত্যেকের বয়ান নিয়ে চলে গেলো। গ্রেপ্তার হল লালু। সে যাওয়ার সময়ে কোনো কথা বলেনি।এত সব গোলমালে সৃজন ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। সে জানে না তার পার্বতী মাসি কেন কাঁদছে। ঠিক এমন সময়ে কেউ যেন বলে উঠলো,

-” পিতা জি আমাকে বাঁচতে দিলো না মাই। আমার আর ফেরা হল না তোমার কাছে। তুমি ভালো থেকো মাই,খুব ভালো থেকো। আমি চলে যাচ্ছি।”

ঘরের মধ্যে একটা বাতাস বয়ে গেলো সেটা যেন কারোর চলে যাওয়ার শেষ ইঙ্গিত।পার্বতী একবার শেষ

-” ঝিলমিল”

বলে চেঁচিয়ে ঢলে পড়লো চিরঘুমে।

Audio Story Starts From Here:

Story InfoName
WriterTrisha Laha
Intro & EndingOlivia Das
KathakSouradip Roy
CharactersName
Lalu SinghSouradip Roy
Jhilmil & ParbatiPriyanka Dutta
TuhinDebanshu Ghosh
Sudha DebiOlivia Das
Sadhan BabuSuman Sadhukhan
Pankaj KakaJoydeep Lahiri
Other voiceJoydeep Lahiri

Find us on Facebook – click here

আরো পড়ুন

What’s your Reaction?
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
1
+1
0
+1
0

About Post Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *