Visits: 8

অদৃশ্যর দৃশ্য:

আমার বড় ছেলে ফটোগ্রাফার। নাম দেবাশীষ। একবার ওর দল নিয়ে সিউড়ীতে গিয়েছিল বিয়ে বাড়ীর ছবি তুলতে।মেয়ের বাড়ি কলকাতায়। সেখানে ছবি তুলে, একদিন পরে গিয়েছিল সিউড়ীতে ছেলের বাড়ি। ছেলের রিশেপ্শন। কাজেই ওদেরকে তো যেতেই হবে। তার ওপর আকাশ মেঘলা। যে কোন সময় বৃষ্টি আসতে পারে। ওরা বলতে, আমার ছেলে দেবাশীষ, মুনমুন, প্রিতম, জয়, তুষার। এই পাঁচ জন সকাল সকালই পৌঁছে গেছে। কারণ ভাত কাপড় ছাড়াও আরো যেসব  রিচুয়াল আছে, সবেরই ছবি তুলতে হবে। ছেলের রিশেপ্শন হচ্ছে ওদেরই বাড়ীতে; বাড়িটা বেশ ছোট। তাই  ফোটোগ্রাফারদের থাকতে দিয়েছে দশ হাত দূরে একটা পুরোনো বাড়িতে। এই বাড়িটা দোতলা আর বেশ বড় বাড়ী। সব মিলিয়ে নীচে আর ওপরে ৮ খানা ঘর। নীচের তলা মোটামুটি বেশ ভাল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। দোতলায় দেখে মনে হয় কেউ থাকে না। সব ঘর অপরিষ্কার, তালাবন্ধ।  তারপর ছাদে ওঠার সিঁড়ি সেও বেশ পুরোনো ঝরঝরে; সেকালের বেঁকা চওড়া সিঁড়ি। নীচের তলায় ছেলের ঠাকুমা ঠাকুরদার ঘর তাঁরা থাকেন। পাশের ঘরটা কেউ না কেউ থাকে। আজ ওদের থাকতে দিয়েছে। কাজেই অন্য আর কেউ নেই।

ওদের ফোটো তোলা শেষ করে খেয়ে দেয়ে আসতে আসতে রাত দুটো-আড়াইটে হয়ে গেল। রাস্তা দিয়ে আসতে আসতে পুরানো বাড়ীর কাছাকাছি আসতেই লোডশেডিং হয়ে গেল। রাস্তায় আলো থাকলেও অন্ধকার দূর হয় না। তাই ওরা মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে আসছিল। তারওপর আবার লোডশেডিং হল। ব্যস্ সোনায় সোহাগা। মুনমুন গজ গজ করে বলতে থাকে,

-‘‘ একেই এই ভ্যাপসা গরম। আর ভাল লাগে না ছাই। একটু পাখা চালিয়ে যে বসবো। তার জো নেই।’’

হঠাৎ তার চোখে পরে আগে আগে কে যেন যাচ্ছে। দেবাশীষের ফোনে আর জয়ের ফোনে টর্চ জ্বলছে তাই তাদের চোখ রাস্তার ওপর। তুষার আর প্রিতম পিছনে আসছে। আলোর আভা যেখানে শেষ হয়েছে ঠিক সেখানে লাল কাপড় পরা আলতাপরা পা দেখা যাচ্ছে। পায়ে নূপুর আছে। মুনমুন বলল,

-‘‘লাল কাপড় পরে কে যাচ্ছে বলতো? দেখতে পাচ্ছিস?’’

দেবাশীষ আর জয় এর চোখে পরে সত্যি আগে আগে কেউ যাচ্ছে। আবছায়ামতো, ভালো বোঝা যাচ্ছে না। প্রিতম,তুষার এগিয়ে এসে বলে,

-‘‘কই কই দেখি।’’ 

ওদের হাতে ক্যামেরা,স্ট্যান্ড সব সরঞ্জাম ছিল। তাড়াতাড়ি সামনে দেখতে আসতে গিয়ে স্ট্যান্ডটা জয়ের মাথায় লাগে আর জয় চেঁচিয়ে ওঠে। তুষার চট্ করে বলে, 

-‘‘সরি ভাই সরি।’’ 

ওদের মধ্যে গোন্ডগোল হওয়াতে কেউ খেয়ালই করেনি  সামনের জন কোথায় গেল। আর দেখতে পায় না তারা তাকে।

বাড়িতে ঢুকে কোন রকমে হ্যাঁৎড়াতে হাঁৎড়াতে ঘর খুলে, আগে জিনিসপত্র রেখে শান্তি। মুনমুন আবার বলে,

-‘‘আমি কিন্তু দেখেছি ঐ লালা কাপড় পড়া বৌটা এবাড়িতেই ঢুকেছে। চল্ একবার দেখি। কোনো চোর নয় তো?’’

-‘‘চোর? লাল কাপড় পরা?’’ মেয়েছেলে চোর?’’ বলে হা হা করে হেসে ওঠে দেবাশীষ। 

-‘‘ঠিক আছে চল্ সবাই টর্চ জ্বেলে। আলো না আসা অবধি তো অপেক্ষা করতেই হবে। তার চেয়ে একটু অ্যাডভেঞ্চারে যাওয়া যাক। চল্ সবাই।’’ 

কথাটা বলেই ওরা পাঁচ জনে ঘর থেকে বেরিয়ে ওপরে ওঠার সিঁড়ির কাছে আসে। প্রিতম বলল,

-‘‘কি দরকার ওপরে যাওয়ার, বারণ করেছে তো?’’

তুষার বলল,

-‘‘যা তুই ঘরে শুয়ে থাকগে যা অন্ধকারে আমরা যাবো। দেখবো কে বা কি আছে ওপরে।’’

প্রিতম জানে অন্ধকারে সে ঘরে থাকতে পারবে না। তাই অগত্যা ওদের সাথে যাওয়া মনস্থির করে নেয়। দেবাশীষ ফোনে EMF Metre এর অ্যাপস ইন্সটল করে নেয়। অ্যাডভেঞ্চার তো! পাঁচ জনেই মোবাইলের টর্চ জ্বালে। EMF অন করে দেবাশীষ। তারপর দোতলায় উঠে দেখে। ঘর গুলো সব তালা বন্ধ। বারান্দায় ধূলোর আস্তারণ। ওরা আবার ওপরের সিঁড়ি ধরে ছাদের দিকে এগোয়। হঠাৎ ছাদে ওঠার পাঁচ ছটা সিঁড়ির নীচে দাঁড়িয়ে পরে সবাই। ছাদের দরজা বন্ধ কিন্তু মাঝের কাঠ ভেঙ্গে ঝুলে পড়েছে। একটা চৌকো গর্ত হয়ে গেছে। সেখান দিয়ে হু হু করে হাওয়া আসছে। মনে হচ্ছে বাইরে বোধ হয় ঝির ঝির করে বৃষ্টি হচ্ছে। দেবাশীষের ফোনটা হটাৎ পিপ পিপ করে আওয়াজ হচ্ছে। একটা লাল আলো জ্বলছে নিবছে। সেদিকে তাকিয়ে দেবাশীষ বলে,

-‘‘দাঁড়াও সব। আর এগোনো উচিৎ হবে না। মনে হচ্ছে নেগেটিভ এনার্জী আছে চার পাশে।’’

 ‘‘আমার কেমন ভয় ভয় করছে। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে”। প্রিতম কেঁদে ফেলার উপক্রম করে।  ‘‘ও দেবাশীষ দা আর এগিয়ো না গো। আমার শরীর খারাপ লাগছে। গা গুলোচ্ছে। বমি বমি ভাব লাগছে। মাথা ঘুরছে। চলো নীচে যাই।’’ দেবাশীষও যতই সাহস দেখাক, ওরও গাটা শির শির করছে। যেন মনে হচ্ছে শরীরের ওপর বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে।

– ‘‘হ্যাঁ হ্যাঁ চল্। নাব্ নীচের দিকে।” 

আস্তে দেখে সবাই নীচে নেমে আসে। একতলায় এসে হঠাৎ অদূরে দেখে সাদা কাপড় জামা পড়ে কারা দুজন দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে চিৎকার করে সবাই

 ‘‘কে? কে??’’

 ‘‘আরে আমি আমি দাদু।’’ সঙ্গে সঙ্গে আলো জ্বলে ওঠে। সবাই দেখে যার বিয়ে হয়েছে, তার দাদু ঠাকুমা। খাওয়া হয়ে গেছে এ বাড়িতে শুতে এসেছেন। ওরা সবাই আসস্ত হল। যাক্ বাবা। দাদু বললেন,  ‘‘তোমরা সবাই ওপরে গিয়েছিলে কেন? তোমাদের বার বার বারণ করেছিলাম।

দেবাশীষ বলে,

“না দাদু আমরা দেখলাম কে যেন ওপরে গেল ভাবলাম চোর টোর হবে, তাই আর কি……”কথা শেষ হবার আগেই দাদু বললেন, 

“যাও সবাই ঘুমোতে। আলো এসে গেছে। আর ভয় নেই।’’

সকালে ঘুম থেকে উঠে সবাই গোছ গাছ করছে রওনা হতে হবে। দাদু মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে ফিরতে, দেবাশীষ ধরলো দাদুকে,

“বলুন না দাদু। কাল আমরা যে লাল কাপড় পরা একটা মেয়ের পা দুটো দেখলাম। নূপুর পরা পা। কে মেয়েটি দাদু বলুন না প্লিজ!’’

দাদু তখন একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলেন,

‘‘আর ভাই। ঐ মেয়েটির বাবা আর আমি দুই বন্ধু ছিলাম। ও ব্যবসা করতো আর আমি চাকরী করতাম। দুজনেই পরামর্শ করে এক ইচ্ছায় এখানে বাড়ী করলাম। আমার বাড়ি হল মাঝারী। ওর বাড়ি হল বড়। যাই হোক ওর ফ্যামিলি হল বড়, তাই বাড়ি বড়ই হল। আমার ঐ বন্ধুর মেয়ের নাম শিমুল। সে একটা গরীব ছেলের প্রেমে পড়ে। ছেলেটি চায়ের দোকানে কাজ করতো। মেয়েটির বয়স মাত্র ১৮ বছর। বাবার, দাদার, কাকার, কারুর পছন্দ ছিল না। তাই জোর করে তাড়াতাড়ি একটা দোজবরে ছেলে দেখে। ছেলেটি খারাপ ছিল না। ভাল চাকরী করতো। বউটা অসুখে মারা যায়। তাই আবার বিয়ে করছে। একটু বয়স বেশী। তা ঐ বন্ধুর মেয়ে শিমুলের পছন্দ হল না। বিয়ের দিন ছাদে গিয়ে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করে।” 

একটু থেমে আবার বলেন,

“তাও হয়ে গেল বছর দশেক। তার মরার দশদিন পর থেকে এই অত্যাচার শুরু হল। নিচে মানে একতলায় নয়। দোতলা থেকে অমন ভয় দেখাতো। কোনরকম ৫ বছর কাটিয়ে তাই ওরা আমায় বাড়ি বিক্রি করে অন্য কোথায় চলে গেল। আমিও কি করবো ভাবছি। বিক্রী করবো না ভেঙ্গে ফেলবো। কিছু ঠিক করতে পারছি না।’’

দেবাশীষ বলে,

‘‘বিক্রী বা ভাঙ্গার কথাও চিন্তা করবেন না এত সুন্দর বাড়ি এত সস্তায় পেয়ে ছেড়ে দেবেন। তার চেয়ে বরং গয়ায় গিয়ে আপনি হোন বা শিমুলের বাড়ির লোকই হোক পিন্ড দান করে আসুন প্রেতশিলায়। দেখবেন সব ঠিক হয়ে গেছে।’’

হঠাৎ তুষার ছুটে এসে ক্যামেরাটা দেখিয়ে বলে,

‘‘এই দ্যাখো দেবাশীষ দা, এটা করে ছবি??”

দেবাশীষ দেখে, দাদুও দেখেন ওদের দোতলার ছাদে ওঠার সিঁড়িতে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিয়ের কনের সাজে। যদিও ছবিটা একটু আবছায়া। দাদু বলে ওঠেন,

 ‘‘আরে এ যে শিমুল। কি আশ্চর্য্য।’’

দেবাশীষ বলে, 

‘দেখছেন দাদু ,ও দেখা দিচ্ছে; ও চাইছে ওর আত্মার সদ্গতি হোক। মুক্তি পাক।’’ 

দাদু মাথা নাড়তে নাড়তে ঘরে চলে গেলেন,

‘‘ঠিক্ ঠিক’’ বলতে বলতে।’’

তারপর দেবাশীষরা পাওনা গন্ডা নিয়ে বেলাতে ওখান ছেড়ে চলে আসে। নমস্কার জানিয়ে।

Audio Story Starts From Here:

Story InfoName
WriterKaberi Ghosh
Intro & EndingPriyanka Dutta
কথকOlivia Das
CharactersName
মুনমুনPriyanka Dutta
দেবাশিসDebanshu Ghosh
প্রীতমSuman Sandhukhan
তুষারJoydeep Lahiri
দাদুNarayan Dutta

Find us on Facebook – click here

আরো পড়ুন

What’s your Reaction?
+1
1
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0

About Post Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *